শেষ ফোনটা আর করা হলো না

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৬-০৩ ১৫:৩৪:০৯
image

মা নুরজাহান,
তোমার নামের পাশে আজ কোনো উপাধি নেই,
নেই কোনো পদ-পদবির ঝলক।
আছে শুধু এক বুক দীর্ঘশ্বাস,
আর এক দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া প্রশ্ন।

তুমি কি কখনও ভেবেছিলে-
যে সন্তানদের জন্য রাত জেগে কাটিয়েছ অগণিত প্রহর,
জ্বরের কপালে পানি ছুঁইয়ে বলেছ
'বাবা,তুই সুস্থ হয়ে যা',
সেই সন্তানেরাই একদিন
তোমার নিথর শরীরের খবরও রাখবে না?

এক ছেলে রাষ্ট্রের উঁচু আসনে,
এক ছেলে জ্ঞানের আলো বিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে,
আরেক ছেলে দূর সমুদ্রের ওপারে
স্বপ্নের দেশে বসতি গড়েছে।
সবাই সফল-
কিন্তু মায়ের শূন্য ঘরে
সেই সফলতার কোনো আলো পৌঁছায়নি।

আট দিন!

পুরো আটটি দিন
একজন মা পড়ে ছিলেন নিঃসঙ্গ অন্ধকারে,
দরজার ওপাশে ছিল নীরবতা,
আর এপাশে জমছিল মৃত্যু।

হয়তো শেষ বিকেলে
তিনি এখনও বিশ্বাস করেছিলেন-
ফোনটা বেজে উঠবে।
কেউ একজন বলবে,
'মা,খেয়েছো?'

হয়তো জানালার দিকে তাকিয়ে
তিনি ভেবেছিলেন,
আজ না হয় কাল,
কাল না হয় পরশু,
আমার সন্তানরা আসবেই।

কিন্তু অপেক্ষারও তো মৃত্যু হয়।

যেদিন দেয়াল গন্ধ চিনে নেয়,
যেদিন প্রতিবেশী মৃত্যু টের পায়,
সেদিনও সন্তানেরা টের পায় না-
এ কেমন সফলতা?

আজ সমাজ আয়নায় নিজের মুখ দেখুক।

যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না,
সে শিক্ষা শুধু সনদ।
যে পদ মর্যাদা মায়ের খোঁজ নিতে শেখায় না,
সে মর্যাদা শুধু অলংকার।
যে অর্থ বৃদ্ধ মায়ের নিঃসঙ্গতা ভাঙতে পারে না,
সে অর্থ শুধু সংখ্যা।

মা নুরজাহান,
তোমার মৃত্যু শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়,
এটি আমাদের সময়ের বিরুদ্ধে
একটি অভিযোগপত্র।

আজও পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম 'মা',
কিন্তু সবচেয়ে অসহায় মানুষও কখনো কখনো
সেই মা-ই হয়ে যান।

যারা মায়ের কোলে মাথা রেখে
পৃথিবী জয় করতে শিখেছিল,
তারা পৃথিবী জয় করেছে ঠিকই,
কিন্তু হারিয়ে ফেলেছে
নিজেদের মানুষ হওয়ার পরিচয়।

তাই আজও বাতাসে ভেসে আসে
একটি অদৃশ্য আর্তনাদ-

'মা কখনো সন্তানের খবর নিতে ভুলে না,
কিন্তু কিছু সন্তান আছে,
যারা মায়ের মৃত্যুর খবরও পায় না-
কারণ তারা অনেক আগেই
নিজেদের হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে ফেলেছে।'

'কী ভয়ংকর এই সময়,
যেখানে জীবিত মা একা থাকে,
আর মৃত মা হয়ে ওঠে জাতির বিবেকের কান্না।'