বর্ষা বসন্ত শ্রাবণ যাায়, হেঁটে যায় অপলক ভোর। নদীস্নেহা আনন্দে ভাসে খেয়া পরাবার ৷ চৈতালী জোছনায় জাগে পৃথিবীর প্রান্তর।তুলিকার বিবর্ণ দিনগুলোতে এখন আর বদলে যাওয়া মৌসুমের ছোঁয়া লাগে না, বর্নিল বসন্তের পাপড়ি ঝরে না। তার দিন কাটে স্বামীহারা কন্যা এবং পিতৃহীন নাতির মলিন বিষন্ন মুখের দীর্ঘশ্বাস ঢাকা অন্তহীন পথে হেঁটে হেঁটে। একটানা একই ভাবে কেটে যায় প্রাণময় এই পৃথিবীর মূল্যবান দিনক্ষণ তার ।অথচ কি যে চাঁদ চুয়ানো সুঘ্রাণ মাখা এক সাম্রাজ্যে বাস ছিল তার। ফুল প্রজাপতি গান আর কবিতায় মুখর ছিল তার পৃথিবী। কোথায় কোন দুর বাতাসে মিলিয়ে গেছে সব। চিরচেনা জোছনা ঝরা চাঁদটাও চিরদিনের মত হারিয়ে গেছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের অতল গহ্বরে। অনেক যত্নে তিল তিল করে গড়ে তোলা নিখাদ পরিবার তার, যেখানে প্রতিটি ভোরই ছিল অনিমেষ সূর্যের আলোময় হাতছানি। কি এমন দায় ঠেকেছিল হুট করে পরম আদরের মেয়েটির বিয়ের আয়োজনে দিশেহারা হওয়ার? সাত পাঁচ না ভেবে সাত জনের অনুরোধে অনন্য মেধা আর প্রতিভাময়ী মেয়েটিকে পাত্রস্হ করার আদৌ কি কোন তাড়া ছিল তার?
' ও তো আমার নিজের মেয়েই, আমরা সবাই অনেক যত্নশীল থাকব ওর অধ্যয়নের প্রতি, অনেক অনেক আদরে থাকবে ও, আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন-----" - এমন কথা যে হরহামেশাই বলে লোভী সুযোগ সন্ধানী পাত্রপক্ষ এ কথাও বুদ্ধির মাথা খেয়ে দিব্যি ভুলেছিল সে। সবচেয়ে অবাক করা কথা, সম্পূর্ণ বেঁকে বসা মেয়ের বাবাকেও ম্যানেজ করে ফেলল তারা। মেয়ের আপন চাচাই আড়ালে ডেকে বোঝালো - ভাইয়া তুমি হার্টের রোগী, তোমার কোন ছেলেও নেই। সুযোগ্য এই ছেলেই তোমার মেয়েকে, তোমার পরিবারকে আগলে রাখবে। সোনার টুকরো ছেলে, আর ফ্যামিলি দেখেছো- এমনটি আর পাওয়া যাবে না।
জমজমাট আয়োজনে পুতুল খেলাপ্রিয় মেয়েটির বিয়ে সম্পন্ন হলো। পুতুল সাম্রাজ্যের স্বপ্নে গড়া আনন্দ উৎসব ছেড়ে নতুন এক অচেনা আনন্দ শিহরিত মন নিয়ে শ্বশুর বাড়ি রওনা দিল সে। মন জুড়ে অনেক আশার প্রদীপ।
খুব অল্প সময়ের মাঝেই একটি একটি করে এই প্রদীপগুলো নিভে যেতে শুরু করল, যেন দানবীয় কোন এক ফুঁৎকারে। এক সময় ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল তার স্বপ্নে দেখা নতুন পৃথিবী। উচ্চশিক্ষিত ধনাঢ্য পরিবারের এই মেয়েটিকে প্রতিদিনের প্রতি নিমেষ সইতে হলো অবর্ণনীয় মানসিক নিপীড়ন। প্রথমে দোষ দেয়া হলো তার ধীর স্হির গম্ভীর ব্যক্তিত্বকে, সে নাকি ততটা মিশুকে নয়, সে নাকি হাসতে জানেনা। এরপরে তার ঘরকন্নার কাজগুলোর তীব্র সমালোচনা। সে নাকি কোন কাজেই দক্ষ নয়। পান থেকে চুন খসলেও তার উপরে খড়গ নেমে আসত। অসহ মানসিক নিষ্পেষণে প্রাণময় সুরভিত একগুচ্ছ ফুল হতে প্রাণহীন পাথর হয়ে যেতে থাকে মেয়েটি। তার জীবন সঙ্গীটি তখনো নিশ্চুপ, পরোক্ষভাবে বাবা মা ভাই বোনদের এই নির্মমতাকেই সমর্থন যোগায়। সে পুরোপুরি বাবার নিয়ন্ত্রণে - বাবার এক কথায় উঠে বসে। দোলার ননদেরা স্বামীসহ বারমাসই পরম সন্মানে শ্বশুরালয়েই আবাস গড়েছেন। দোলাকে মানসিক নিষ্পেষণে ইন্ধন যোগাতে তাদের স্বামীরা দক্ষ বীরপুরুষ সাজেন। শত চেষ্টাতেও দোলা তাদের মন পায়না। এক একটা সময় দোলার এমনও মনে হয় তারা তাকে আদৌ কি একজন মানুষ হিসাবে গণ্য করছেন নাকী অন্য কোনো প্রাণী ? অবস্থা আরো ভয়াবহ দাঁড়ায় -- দোলা দেখে সুযোগ পেলেই এই মানুষটি তার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে হাত দিচ্ছে খুব অনায়াসেই। যেন এটা তার অধিকার। নিরুপায় দোলা প্রিয় মানুষটির কাছেই নিরাপত্তার জন্য ছুটে যায়। এই বীভৎস ঘটনার কথা স্বামীকে জানাতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে সে। কিছু সময় নিশ্চুপ থেকে গর্জে উঠেন তার চিকিৎসক কর্মকর্তা স্বামীটি। দোলার নীচু, নোংরা এবং সন্দেহপ্রবন মন -- কতটা নোংরা হলে একজন ভাল মানুষ সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারে সে-- চিকিৎসক স্বামী কঠোর তিরস্কার করেন দোলাকে। বাকরুদ্ধ দোলা এরপরে আর কিছু বলার মত ভাষা খুঁজে পায়না। তার শুভ্র মেঘের আকাশ, ভেজা ফুল, দুর হতে ছুটে আসা দমকা বাতাস ঘনঘোরের এক নির্মম অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে।দিশেহারার মত তার চেনা পৃথিবীটাকে খুঁজতে থাকে, যেখানে আলোময় সূর্যেরা জোছনা পরাগ কুড়ায় আনন্দে উৎসাহে। সবরকম পবিত্রতা নিয়ে বাঁচার অদম্য প্রয়াসে দোলা নিজেই তার চারপাশে কঠোর এক নিরাপত্তা বলয় গেঁথে নিতে তৎপর হয়। সে শয়নকক্ষের চারদেয়ালের মাঝেই স্বঅবরুদ্ধ থাকে। পারতপক্ষে ঘর থেকে বের হয় না।তাতেও রক্ষা নেই, এবারে স্বশুর বাড়ির প্রতিটি সদস্য মিলে দ্বিগুন মানসিক নিপীড়ন শুরু করে। কিসের এত অহংকার তোমার-' - বলে সারাক্ণই চিৎকার করতে থাকে। দোলার শ্বাসরুদ্ধের মত অবস্হা হয়। এত অবর্ণনীয় যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ---, কার কাছে কেমন করে ব্যক্ত করবে সে? কার কাছে পাবে একটু সাহস সান্তনা আর নিরাপদ আশ্রয়?
তখনো মেডিকেল গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পারেনি, এর মাঝেই দোলা নিজের অভ্যন্তরে আরেকটি সত্তার উপস্হিতি টের পেয়ে যায়।
একই সাথে তার চিকিৎসক স্বামীর একাধিক পরকীয়ার সম্পর্ক গুলোও সে টের পায়, নিশ্চিত হয়। দোলার পায়ের নীচ হতে যেন পৃথিবীর সব মাটি সরে যেতে শুরু করে। মোমিন যে এতটা নোংরা এবং নিচু স্বভাবের হতে পারে সে ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি তা। এতটা জঘন্য কি করে হয় মানুষ! দোলার মাথার উপরে পুরোটা আকাশ যেন ভেঙে পড়ে। মোমিনকে জিজ্ঞেস করলে সে দিব্যি সবকিছু অস্বীকার করে। কিছু পরেই শান্ত এবং স্বাভাবিক হয়ে দোলাকে অনুরোধের স্বরে বলে- তাকে ভুল না বুঝতে। এমন কিছু কখনোই করবে না সে, কখনোই করেনি।
মেডিকেলের ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার আগেই একটি পুত্র সন্তানের মা হয় দোলা। হাজার চেষ্টাতেও সে পরীক্ষা সবগুলো ভালভাবে দিতে পারেনা।অল্পের জন্য সার্জারীতে ফেল করে। মনকে বোঝায় কি চমৎকার একটি পুত্র সন্তানের মা হয়েছে সে।এই অর্জন অনেক বড়।৷ এক সাবজেক্টে ফেইল -- মেডিকেলে এটা তেমন বড় কিছু নয়। পরেরবার নিশ্চয়ই অনেক ভাল ভাবে পাশ করবে সে। এর মাঝে শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার যেন কয়েক গুন তীব্র হয়ে ফিরে এসেছে। শাশুড়ী ননদদের ঝাঁঝালো বাক্যবাণ সকাল দুপুর সন্ধ্যা ---ধারালো বিষাক্ত তীরের মতে বিঁধতে থাকে তাকে-, ঝাঁঝরা করে ফেলে তার শরীর মন। অসুস্থ শরীর নিয়ে সারারাত বাচ্চা কোলে বসে থাকা দোলাকে শুনতে হয় - সে সংসারী নয়, এর আগে যেন পৃথিবীর আর কারো বাচ্চা হয়নি-----। সে সন্তান পালনে একেবারেই মনোযোগী নয়, না হলে বাচ্চা সারারাত কাঁদবে কেন? এবারেও দোলার স্বামী বরাবরের মতই নীরব দর্শক শ্রোতার ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া সে তো সময়ের বেশিটাই বাড়ির বাইরে -- ঘরে স্ত্রী সন্তানের খোঁজ নেয়ার মত সময় তার একেবারেই নেই। বিরামহীন এই নিপীড়ন দোলাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। একটানা হতাশা আার বিষন্নতায় তলিয়ে যেতে যেতে নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে একটা সময়। অসুস্থ হতে হতে সে পোস্ট পার্টাম সাইকোসিসের দিকে যায়। পোস্ট পার্টাম সাইকোসিসে আক্রান্ত মেয়েটি সময়ে অসময়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে থাকে। শাশুড়ী যেন তার এই অবস্হায় তারই সাথে প্রতিযোগীতায় নামেন, তার চেয়েও তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদেন-- ও মা গো আমার কি হবে গো, এ তো দেখি বদ্ধ পাগল। শেষে কি না এই ছিল আমার ভাগ্যে, আমার একমাত্র ছেলের বউ পাগল----।
এই পরিবেশ - পরিস্থিতির মাঝেই দোলা দিন রাত পরিশ্রম করে আবারো পরীক্ষা দেয়। কিছুতেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারে না বলে আবারো ফেল করে সে। তার মত প্রখর মেধাদীপ্ত মেডিকেল পড়ুয়ার পক্ষে পরপর দুবার ফেলের এই ব্যর্থতা মেনে নেয়াটাও দুষ্কর হয়ে পড়ে। ঠিক এ সময়ই ডাঃ মোমিনের পরকীয়া সম্পর্কের প্রত্যক্ষ প্রমাণগুলো তার হাতে আসে। কমপক্ষে চারজনের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত সে। এদের মাঝে দুজন চিকিৎসক, একজন গৃহবধূ আর বাকীজন মেডিকেল স্টুডেন্ট -- মোমিনের চেয়ে প্রায় সতের বছরের ছোট। ক্ষোভে শোকে পরোপুরি পাথর হয়ে যায় দোলা। দোলার প্রশ্নের মুখে মোমিন সত্যিকারের এক অমানুষ বনে যায় এবার। -"মেনে নিতে না পারলে তুমি চলে যাও, আমি ওদের কাউকেই ছাড়তে পারব না "--- মোমিনের কন্ঠস্বর জানোয়ারের মত শোনাচ্ছিল তখন। এতটা আঘাত কষাঘাতের পরেও দোলা যখন তার কোলে থাকা শিশুপুত্রের মুখ অপলক দেখছিল, দোলার মনে অনিশ্চয়তার এক ভয়াবহ তান্ডব-----, এই সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেলে তার আদরের ধন বুকের মানিক শিশুপুত্রের জীবনটাও তছনছ হয়ে যাবে। কি করবে দোলা এখন? এইসব সহ্য করে এখানে থাকবে নাকি বাচ্চা কোলে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়বে? এ বাড়িতে আসার পর থেকে যত শত সহস্র মানসিক নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত হয়েছে তার সবগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে এই বর্বরতা, এই লাম্পট্য। বিয়ের অল্প কিছুদিন পর থেকেই মোমিন তার প্রতি চরম অবহেলা দেখিয়েছে, এমনকি প্রচুর আয় উপার্জন থাকার পরেও তাকে কোনরকম খরচও দিত না সে। দোলার মেডিকেল অধ্যয়নের খরচ হতে শুরু করে তার প্রতিটি চাওয়া পাওয়া বাবা মাকেই মেটাতে হয় এখনো। এমনকি তার প্রেগনেন্সি, সিজার হতে শুরু করে শিশুপুত্রের পুরোটা খরচের জন্য বাবা মায়ের কাছেই চাইতে হয়েছিল দোলাকে। এতদিন কিছু মনে হয়নি কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনে হলো - এর মাঝেই মোমিনের পুরোটা পরিচয়,, পুরোটা চারত্রিক বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে ছিল, সে বুঝতে পারেনি। মোমিন দুহাতে অর্থ উড়িয়েছে তার অনৈতিক নোংরা অভ্যাসের পেছনে।এভাবেই অভ্যস্হ সে । বাচ্চার প্রতি তার বিন্দুমাত্র দয়া মায়া নেই, কখনোই ছিলনা। আজ পর্যন্ত একটিবারের জন্যেও সে বাচ্চাটাকে কোলে পর্যন্ত নেয়নি।
দুদিন হলো দোলা তার প্রিয় বাসগৃহে - তার মায়ের বাড়িতে। মোমিন নিজেই তাকে এখানে রেখে গেছে। তিনদিন আগে সে খুব হঠাৎ করেই বাতে বাড়ি ফিরে বলল,- আমি এক মাসের জন্য একটি ফরেইন কোর্সে যাচ্ছি, তুমি তোমার বাবার বাড়ি ঘুরে এসো।অনেকদিন তো যাওনা। দোলা খুশি হয়ে ভাবে - হঠাৎ করে তার প্রতি মোমিনের এই সদয় আচরণ! কি হতে পারে কারণ?
সাতদিনের মাথায় মোমিন তাকে মোবাইলে জানায়, সে ডিভোর্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দোলার সংগে জীবন কাটানো সম্ভব নয়, তার সাথে মনের মিল একেবারেই নেই। দোলা অবাক হয়।
তোমার না কানাডায় থাকার কথা এখন?
যাইনি।
মানে? একদিন পরেই তো যাবে বলেছিলে।
শোনো, এভাবে তর্ক কোরোনা। যা বলেছি, আমার ফাইনাল ডিসিশন এটাই। আমি এই সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমার ঘৃনা ধরে গেছে এই সম্পর্কে।
আমার কি অপরাধ মোমিন ? কি দোষ করেছি আমি?
আমি বাধ্য নই উত্তর দিতে। আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি ডিভোর্স দেব তোমাকে, ব্যস।
মোমিন ফোন কেটে দেয়।এরপরে প্রায় দু সপ্তাহ মোমিন দোলার ফোন রিসিভ করে না। দোলা বাধ্য হয়ে বাবা মাকে জানায়। তারা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকেন। এর আগে কখনোই তো তাদের আদরের মেয়েটি মোমিন সম্পর্কে এমন কোন ধারনা দেয়নি। হঠাৎ কি এমন হলো তাদের? তারা মোমিনের বাবার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন দোলাকে তাদের পছন্দ নয়।
আপনি এখন বলছেন এ কথা? আপনার একজন নাতি আছে। ওর কি হবে ভেবেছেন? ভাই, আমার অনুরোধ - আমার মেয়ে কোন ভুল করলে এবারের মত ক্ষমা করে দেন। আমি কথা দিচ্ছি আপনি যেভাবে বলবেন, যা বলবেন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে আমার মেয়ে।
আপনার মেয়ে? ও তো একজন মানসিক রোগি। বড়দের যে সন্মান করতে হয় এ শিক্ষাও তো আপনারা তাকে দেননি।
মাফ করে দেবেন ভাই। ও তো আপনারই মেয়ে। সন্তানের কত শত ভুলই তো বাবা মা ক্ষমা করে দেয়। আমি বাবা হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ভাই আর একবার অন্তত সুযোগ দিন।
এসব এখন বলে তো কোন লাভ নেই। আর আপনার মেয়ে ভীষণ বেহিসেবী। আমার ছেলেকে তো পথের ফকির বানিয়ে ছেড়েছে।
পাশে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল দোলা। দোলা বাকরুদ্ধের মত বাবার মুখে চেয়ে থাকে।আজ পর্যন্ত এক কানাকড়িও তার জন্য খরচ করেনি মোমিন,, এমনকি তার শিশুসন্তানের জন্যেও না। দোলা স্বীকার করে সে সাজ পোশাকে তার নিজস্ব স্টাইল এবং রুচি বজায় রেখে চলে। কিন্তু সৌখিনতার পুরো ব্যয়ভারই তো তার বাবা মা বহন করেছেন। মোমিন ভুলেও জানতে চায়নি কোথা হতে আসছে তার স্ত্রী সন্তানের ভরন পোষন এবং অন্য সব খরচ।
এরপরেও দোলা এবং তার বাবা মা সাধ্যের সবটা দিয়ে চেষ্টা করে যান মেয়ের সংসারটা টিকিয়ে রাখতে। দোলা নিজেও অনেকবার মোমিনের সাথে কথা বলতে চেয়ে ব্যর্থ হয়। সে শিশু পুত্র কোলে তাদের বাড়িতে( কিছুদিন আগেই যা তার নিজের বাড়ি ছিল) ফিরে যায়। মোমিনদের মেইন গেইট বন্ধ। ভেতর থেকে তালা দেয়া। এটা আর এমন কি, দোলা ভাবে - চাবি তো তার কাছেও একটা আছে, এক্ষুণি খুলে ফেলবে এবং এরপরে আর কখনোই বাড়ি ছেড়ে যাবে না। বোকামি যা করার একবারই সে করেছে। সরল মন আর পরিবেশে বেড়ে ওঠা তরুণী দোলা তখনো জানত না ইতমধ্যেই বদলে ফেলা হয়েছে এ বাড়ির লক সিস্টেম। দোলার হাতের মুঠোর নিরাপদে থাকা চাবি দিয়ে আর কখনোই খুলবে না এ বাড়ির দরজা। দোলা কলিংবেলের বাটনে চাপ দেয়। বন্ধ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে দীর্ঘসময় মোমিনের নাম ধরে ডাকে -একা অসহায় দোলা।
পরদিন বাবা মাকে সংগে নিয়ে দোলা মোমিনের অফিসে যায়। সিনিয়রদের অনুরোধ করে মোমিনকে বোঝানোর জন্য। একটিবারের জন্যে হলেও মোমিনকে তার সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য। হতবাক দোলা তার বিরুদ্ধে আনা মোমিনের গুরুতর অভিযোগের লম্বা লিস্ট দেখে। মোমিন আগেই সাজিয়ে রেখেছে সব। ডিভোর্স বৈধকরণের কোন ক্রাইটেরিয়াই সে বাদ রাখেনি। সমাজ যাতে দোলার দিকেই আংগুল তুলে - ঐ যে দেখছ না ঐ মেয়েটাই তো - - একটুও সংসারী না, শ্বশুর শাশুড়ীকে সন্মান করে না, স্বামীর যত উপার্জন একাই ভোগ করে - সব টাকা নিয়ে নেয়, বাচ্চাটাকেও সহ্য করতে পারে না, ইদানীংকালে তো আবার বড় রকমের মানসিক অসুখ হয়েছে, আর জানো ওর চরিত্র কিন্তু ভীষন রকমের খারাপ।" দোলার চোখ ফেটে কান্না আসে - মোমিন তার সম্পর্কে এত লম্বা অভিযোগ করেছে, যার একটিও বিন্দুমাত্র সত্যি নয়। মোমিন কি করে পারল এমন, কি কারণে সে করল এমন--? দোলার বাবা মাও যেন লজ্জায় অপমানে মাটিতে মিশে গেলেন যখন তারা দেখলেন মোমিনের হাসপাতালের সবাই কোন প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়াই তার প্রতিটি অভিযোগই বিশ্বাস করেছে। এই সমাজ যেন তৈরি হয়ে আছে ডিভোর্স দিতে যাওয়া প্রতিটি পুরুষকে বীরপুরুষ হিসেবে বরণ করে নিতে আর বিনাদোষে ডিভোর্সড মেয়েদের গায়ে সব রকমের কালিমা মাখাতে।
রোদক্লান্ত দুপুরের অবশেষে দোলা যখন ফিরে আসে তার মনে হয় পেছন থেকে সবাই তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ছুটে আসছে -- চরিত্রহীনা- নষ্টা' --বলে সম্মিলিত চিৎকার করে।
কিছু কানাঘুষা সবার সাথে সাথে দোলারও কানে আসে। মোমিন নাকি তার চেয়ে সতের বছরের ছোট সেই মেডিকেল পড়ুয়া তার ছাত্রীকেই বিয়ে করেছে। মোমিনের বাবা নাকি সেই মেয়েকে নিজের গাড়িতে করে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছেন। দোলার বিশ্বাস হয় না, কি করে সম্ভব, তাদের তো এখনো ডিভোর্স হয়নি। ডিভোর্স না দিয়েই আবারো বিয়ে? কথা থেমে থাকেনা। চারদিক হতে বিভিন্ন রকমের কথাবার্তা আসতেই থাকে। মোমিন নাকি দিব্যি তার ছাত্রী মেডিকেল পড়ুয়াকে নিয়ে সংসার পেতেছে। যে বাড়ির বদলে যাওয়া তালা দোলার পুরোনো চাবি দিয়ে খোলেনি সেই তালার নতুন চাবি এখন মোমিনের নতুন বৌয়ের হাতে। দোলা তবুও ভাবে -- এও কি সম্ভব? দোলার এই ভাবনার মাঝেই মোমিনের দেয়া তালাকনামা তার হাতে এসে পৌঁছায়। আজ হতে আইনত তারা আর স্বামী স্ত্রী নয়। দোলার বিশ্বাসে নাড়া দেয় বেআইনি এক প্রশ্নের অধ্যায়----- তাহলে সত্যি সত্যিই ডিভোর্সের আগেই দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল মোমিন? অবৈধভাবে অনেকদিন একসাথে দুই বউকেই রেখেছিল সে? নিজের প্রতি ধিক্কার আর ঘৃনায় দেহ মনের পুরোটাই জ্বলতে থাকে দোলার।
আরও কিছুদিন পরে হতবিহ্বল প্রতিবেশীর প্রশ্নের উত্তরে মোমিনের বাবা খুব আত্মতৃপ্তির সাথে উত্তর দিতে থাকেন -- না না বিয়ে এখনো করেনি আমার ছেলে। ও তেমন ছেলেই নয়। তবে মনে হয় একটি মেয়েকে ওর মনে ধরেছে। হয়ত বিয়ে করবে অথবা করবে না। এত কথা আলোচন সমালোচনার মাঝেই মেয়েটির গর্ভাবস্হা টের পেয়ে তড়িঘড়ি ছেলের বিয়ের আয়োজন করেন মোমিনের বাবা। বিয়ের ঠিক ছয় মাসের মাথায় মেয়েটি মা হয়। সমাজ রাষ্ট্র পরিবার তাতেও চুপ। তারা সবাই খুশি - সবাই বাহবা দিতে থাকে-- এই না হলে পুরুষ! বিয়ের আগেই যে সম্ভাব্য পিতৃত্বকে স্বীকৃতি দেয় সেই তো প্রকৃত পুরুষ।
মনে প্রাণে ভেঙে পড়া দোলা শ্বাসরুদ্ধের মত ভাবে - উচ্চতম সমাজের এই শিক্ষিত পরিবারের এ কোন রুপ? এতটা অন্যায়, এতটা ব্যভিচার । মানুষরুপী দুই পেয়ে পশুদের বাসও তাহলে এখানেই? এতটা নোংরামি এত আবর্জনা এত দূর্গন্ধ এখানে? এরা কি ভাবে নিশ্বাস নেয়, মিথ্যা ভালবাসার গল্পে কি ভাবে রাতদিন কাটে এদের, কি মন নিয়ে সূর্যের আলো দেখে তারা?
সেই থেকে দোলার বাবা মায়ের সব হাসি আনন্দ চিরতরে মুছে গেছে তাদের জীবন প্রহর থেকে।তুলিকা ভাবে যে মেয়ের সামান্য ঠান্ডা লাগলেও পাগলপারা দশা হতো তার, সেই মেয়েটির টুকরো টুকরো হওয়া জীবনের সামনে কি করে দুপায়ে দাঁড়িয়ে আছে সে? সে কি বেঁচে আছে? আসলেই কি বেঁচে আছে সে? আপন ঠিকানার - আপন ঘরের চাবি হারানেো প্রিয় তার মেয়েটি তার বুকেই ফিরে এসেছে আবারো।পরম যত্নে ভালবাসায় মেয়ে এবং নাতিকে আগলে রেখেছে সে। কিন্তু তার জীবনের সবগুলো বসন্ত, বসন্তের রং বাহারী ফুল, ডানা মেলা পাখি ঘন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। চোখ জুড়ে মন জুড়ে পুরো পৃথিবী জুড়ে স্বামী হারা মেয়ে আর পিতৃহারা প্রিয় নাতির বিষন্ন মুখ। এই বিষন্ন ভারাক্রান্ত দিনগুলো একটি একটি করে হেঁটে যায় তার বুকের উপর পা ফেলে ফেলে। পাঁজরের সবকটি হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় তার। পাঁজর ভাঙা দীর্ঘশ্বাসে রোজই ভরে উঠে পৃথিবীর বাতাস।
ছোট গল্পটা লিখতে গিয়ে বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে ভেবে কেটে কুটে কিছুটা ছোট করলাম। বেশি খাপছাড়া হয়ে গেল কি? যদি তাই হয়, যদি বেশি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমা করবেন তো??