প্রতি বছর ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। কিন্তু সেই আনন্দের পথই যখন মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পেরেছি? টাঙ্গাইলের কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় রডবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ শ্রমজীবী মানুষের প্রাণহানির ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়,এটি আমাদের পরিবহনব্যবস্থা,প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামাজিক বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
যারা নিহত হয়েছেন,তারা কেউ ধনী পরিবারের মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন হকার,দিনমজুর,খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। জীবনের ঝুঁকি জেনেও কম ভাড়ায় পণ্যবাহী ট্রাকে বাড়ি ফিরছিলেন। কারণ তাদের সামনে বিকল্প ছিল না। বাড়ি ফেরার তীব্র আকুলতা,সীমিত আয় এবং যাত্রীবাহী পরিবহনের উচ্চ ভাড়া তাদের ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে।
এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো-বাংলাদেশে ঈদযাত্রা মানেই এখনো এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি,অতিরিক্ত যাত্রী,ক্লান্ত চালক,বেপরোয়া গতি এবং পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী বহনের সংস্কৃতি এখন ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,এসব অনিয়ম সবার চোখের সামনেই ঘটে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ বহন থামানো যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে-কেন? শুধুই কি জনবল সংকট, নাকি নজরদারির ঘাটতি ও দায়িত্বহীনতা?
ঈদের আগে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ে। এই বাস্তবতা নতুন নয়। তাহলে প্রতি বছর একই বিশৃঙ্খলা কেন তৈরি হয়? কেন পর্যাপ্ত গণপরিবহন বাড়ানো হয় না? কেন শ্রমজীবী মানুষের জন্য স্বল্পভাড়ার নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় না?
সরকারের উচিত এখনই কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া-
প্রথমত, ঈদযাত্রায় পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন ও লক্কর-ঝক্কর গাড়ির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। শুধু জরিমানা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সরাসরি জব্দ করতে হবে।
তৃতীয়ত, শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ ঈদ পরিবহন সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন, যাতে তারা কম খরচে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।
চতুর্থত, দীর্ঘপথে চালকদের বিশ্রাম নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।
অন্যদিকে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। জীবনের চেয়ে বড় কোনো তাড়াহুড়া নেই। কয়েকশ টাকা বাঁচাতে পণ্যবাহী ট্রাকে ওঠা মানে নিজের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলা। পরিবারকে ঈদের আনন্দ দিতে গিয়ে যদি প্রাণই হারাতে হয়, তাহলে সেই যাত্রার কোনো মূল্য থাকে না।
কালিহাতীর এই দুর্ঘটনা হয়তো কয়েকদিন সংবাদে থাকবে,তারপর আবার নতুন খবর আসবে। কিন্তু যেসব পরিবার তাদের প্রিয় মানুষ হারিয়েছে,তাদের শোক কখনো শেষ হবে না। তাই এখনই সময় নিরাপদ ঈদযাত্রাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার।
কারণ,ঈদে মানুষ বাড়ি ফিরবে আনন্দ নিয়ে-লাশ হয়ে নয়।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস চেয়ারম্যান-নিরাপদ সড়ক চাই।