ঈদযাত্রায় মৃত্যুমিছিল বন্ধে এখনই কঠোর সড়ক নিরাপত্তা আইন চাই

  • তামান্না মিজান
  • ২০২৬-০৫-২১ ১৬:২৫:১৭
image

বাংলাদেশে ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল, ব্যস্ত মহাসড়ক, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে—মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার দীর্ঘ তালিকা। প্রতি বছর ঈদের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে প্রাণ হারান শত শত মানুষ। পরিবার হারায় উপার্জনক্ষম সদস্য, শিশু হারায় বাবা-মা, আর অসংখ্য মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। অথচ এই মৃত্যুগুলোর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য।
ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সড়কে বিশৃঙ্খলা এখন যেন একটি “স্বাভাবিক” ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, ক্লান্ত ড্রাইভারের দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো—এসব কারণ বহু বছর ধরেই চিহ্নিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং কঠোর জবাবদিহিতার অভাবে পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে না।
বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও তা বাস্তব প্রয়োগে দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, পরিবহন খাতের অসংগঠিত ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে আইন কার্যকর হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, আর সাধারণ মানুষকে দিতে হয় জীবনের মূল্য।
এখন সময় এসেছে নতুন ও যুগোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের। এই আইনে কয়েকটি বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রথমত, প্রতিটি গণপরিবহনে ডিজিটাল স্পিড মনিটরিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা ও লাইসেন্স স্থগিতের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দূরপাল্লার যানবাহনের চালকদের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করতে হবে। ক্লান্ত ড্রাইভিংকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। শুধুমাত্র কাগজে-কলমে নয়, প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে যানবাহনের উপযুক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে দায়ী চালক ও পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সড়ক নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এনে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন শুধু উড়ালসেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহ বৃদ্ধি এবং এতে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সম্পৃক্ততা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সংঘটিত মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। শুধু ২০২৪ সালেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২,৬০৯ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৩৫.৭৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দুর্ঘটনায় অধিকাংশ ভুক্তভোগীই তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সী মানুষ। দ্রুতগতিতে চালানো, বেপরোয়া ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং সামাজিক মাধ্যমে “রিস্কি রাইডিং” সংস্কৃতি এই ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক চালক ও আরোহী এখনও মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করেন না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে হেলমেট ছাড়াই মোটরসাইকেল চালানো হয়। বিশ্বব্যাংক ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের ৮৮ শতাংশের মাথায় হেলমেট ছিল না। দেশে এখনও মানসম্মত হেলমেট যাচাই ও বাধ্যতামূলক ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে নিম্নমানের বা নকল হেলমেট ব্যবহার করেও অনেকে নিরাপদ থাকার ভ্রান্ত ধারণায় থাকেন। অথচ একটি মানসম্মত হেলমেট মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
ঈদ আনন্দের উৎসব। কিন্তু প্রতি বছর যদি এই উৎসব লাশের মিছিলে পরিণত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই সামনে আনে। আমরা আর নতুন কোনো শোকসংবাদ চাই না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন আর কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল রক্ষা পেতে পারে হাজারো প্রাণ।
রাষ্ট্রের কাছে আজ জনগণের একটাই দাবি—“নিরাপদ সড়ক আমাদের অধিকার, বিলাসিতা নয়।”


ব্র্যাক সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি