ঈদযাত্রার শঙ্কা ও যমুনা করিডোরের বাস্তবতা-ফোরলেন সড়কের গতি থামছে ওয়ানওয়ে সেতুর সংকটে

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৫-২০ ২১:০২:৫৫
image

পবিত্র ঈদুল আযহা সামনে এলেই দেশের অন্যতম ব্যস্ত যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়ক নতুন করে আলোচনায় আসে। কোটি মানুষের ঘরমুখী যাত্রা, কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী যান-সব মিলিয়ে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ২৩ জেলার মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে এই মহাসড়ক। কিন্তু প্রতি বছর ঈদ এলেই একই চিত্র ফিরে আসে-দীর্ঘ যানজট, চরম ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তিকর যাত্রা। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন সড়কের কাজ শেষ হওয়ায় যানবাহন দ্রুতগতিতে চলতে পারছে। কিন্তু এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত অংশে এসে সেই গতি হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। কারণ, বিশাল যানচাপ সামলাতে পারছে না যমুনা সেতুর বিদ্যমান একমুখী চলাচল ব্যবস্থা। ফলে চার লেনের গতিশীল সড়ক এসে আটকে পড়ছে সংকীর্ণ প্রবেশমুখে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটাই এখন দেশের অন্যতম বড় 'সড়ক বটলনেক'।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশে চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস ও সার্ভিস লেন নির্মাণ চলমান থাকায় সড়ক সংকুচিত হয়ে আছে। ফলে যানবাহনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে চার লেনের চাপ, অন্যদিকে সেতুর সীমিত সক্ষমতা-দুইয়ের সংঘাতে পুরো করিডোরে সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট।
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু ঈদের সময় তা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন লক্কর-ঝক্কর যানবাহন, যত্রতত্র পার্কিং, অনিয়ন্ত্রিত যাত্রী ওঠানামা এবং পশুবাহী ট্রাকের বিশৃঙ্খল চলাচল। ফলে সামান্য দুর্ঘটনা বা একটি গাড়ি বিকল হলেই কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক সড়ক নিরাপত্তা সভায় ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যমুনা সেতু গোলচত্বর, এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, ঘারিন্দা ওভারব্রিজ, করটিয়া বাইপাস, পাকুল্ল্যা ও মির্জাপুরের হাটুভাঙ্গা এলাকা। এসব স্থানে অতিরিক্ত যানচাপের কারণে যেকোনো সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
মহাসড়ক ঘেঁষে বসবাসকারী স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ পার্কিং এবং ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ওঠানামা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষ করে পশুর হাট ঘিরে মহাসড়কের পাশে ট্রাক থামিয়ে পশু ওঠানামা করানোর প্রবণতা যান চলাচলকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
চালকদের ভাষ্য, সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হলো একযোগে ছুটি শুরু হওয়া। সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে ছুটি দিলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়তে চায়। এতে মহাসড়কে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। তারা পর্যায়ক্রমে ছুটি কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
যদিও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে চার লেনের অধিকাংশ অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তবুও যমুনা সেতুর সংকীর্ণ চলাচল ব্যবস্থার কারণে পুরো চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ২৪ ঘণ্টা টোল আদায় চালু থাকবে। দুই প্রান্তে মোট ১৮টি বুথ দিয়ে যানবাহন পারাপার নিশ্চিত করা হবে। মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা বুথও থাকবে। পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনাও করছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান কী-সেই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, উত্তরবঙ্গের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় বর্তমান যমুনা সেতু আর পর্যাপ্ত নয়। তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ কিংবা বিদ্যমান সেতুর সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
এছাড়া মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, পশুবাহী ট্রাকের জন্য নির্দিষ্ট লেন, যাত্রী ওঠানামার নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করা এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাও জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত মহাসড়ক তদারকি।
ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার আর প্রিয়জনের কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই যাত্রা যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে পড়ে, তাহলে উৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তাই এবারের ঈদযাত্রাকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও যানজটমুক্ত করতে প্রশাসন, চালক, যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সম্পাদক-সকালের আলো ডট কম