জিলহজ্বের প্রথম ৯ দিন : রহমত,ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির অনন্য মৌসুম

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৫-১৫ ২১:৫১:১০
image

ইসলামি বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস পবিত্র জিলহজ্ব। এই মাস শুধু হজের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর প্রথম ৯ দিন আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয় ও ফজিলতময় সময় হিসেবে বিবেচিত। মুসলমানদের জন্য এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা, নফল ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ।
পৃথিবীর অন্য সময়ের তুলনায় এই দিনগুলোতে নেক আমলের মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই সময়কে ইবাদতের বসন্ত হিসেবেই দেখেন।

কুরআন ও হাদিসে গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
'শপথ ফজরের,শপথ দশ রাতের।'
তাফসিরবিদদের একটি বড় অংশের মতে, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজ্বের প্রথম দশ দিনকেই বোঝানো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
পৃথিবীর কোনো দিনের আমল আল্লাহর কাছে জিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে বেশি প্রিয় নয়।
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?
তিনি বলেন, না, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া যে নিজের জীবন ও সম্পদ নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি।
এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, জিলহজ্বের প্রথম দিনগুলো কতটা মর্যাদাপূর্ণ।

প্রথম ৯ দিনের বিশেষ আমল
বেশি বেশি নফল নামাজ
এই সময় ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাহাজ্জুদ, সালাতুত তওবা, ইশরাক ও চাশতের নামাজ আদায় করলে আল্লাহর রহমত লাভের সম্ভাবনা বাড়ে।

রোজা রাখার ফজিলত
জিলহজ্বের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষ করে ৯ জিলহজ্ব অর্থাৎ আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন-
আরাফার দিনের রোজা অতীত এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হয়।
যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তাকবির,তাহলিল ও জিকির
এই দিনগুলোতে বেশি বেশি বলা উত্তম-
আল্লাহু আকবার
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আলহামদুলিল্লাহ
সুবহানাল্লাহ
ঘর, মসজিদ, কর্মস্থল-সব জায়গায় আল্লাহর জিকিরে মুখর থাকা একজন মুমিনের ঈমানকে দৃঢ় করে।

কুরআন তিলাওয়াত
জিলহজ্বের দিনগুলো কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করারও উত্তম সময়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা ও আমলের চেষ্টা আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়।

তওবা ও আত্মসমালোচনা
মানুষ ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই দিনগুলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুবর্ণ সুযোগ। আন্তরিক তওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং জীবনে নতুন আলো এনে দেয়।

আরাফার দিন : রহমতের মহাসমুদ্র
৯ জিলহজ্ব আরাফার দিন ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজযাত্রীরা এই দিনে আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। এটি হজের মূল রুকন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
আরাফার দিনের চেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার দিন আর নেই।
এই দিনে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও কান্নাভেজা প্রার্থনা আল্লাহর নিকট বিশেষভাবে কবুল হয়।

কোরবানির শিক্ষা
জিলহজ্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)–এর অবিস্মরণীয় ত্যাগের ইতিহাস। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও উৎসর্গ করার মানসিকতা একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।
আজকের ভোগবাদী সমাজে জিলহজ্বের শিক্ষা মানুষকে সংযম, আত্মত্যাগ ও মানবিকতার পথে আহ্বান জানায়।

বর্তমান বাস্তবতায় এই দিনের তাৎপর্য
বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানসিক অস্থিরতা, হিংসা ও আত্মকেন্দ্রিকতায় আক্রান্ত। এই অবস্থায় জিলহজ্বের প্রথম ৯ দিন মানুষকে আত্মিক শান্তি ও নৈতিকতার দিকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি করে।
এ সময় শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করা এবং সমাজে মানবিকতা ছড়িয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ আমল।
জিলহজ্বের প্রথম ৯ দিন কেবল একটি ধর্মীয় সময় নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহামূল্যবান সুযোগ। এই দিনগুলোকে অবহেলা না করে ইবাদত, জিকির, রোজা ও মানবিক কাজের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে একজন মুমিনের জীবন আলোকিত হতে পারে।
হয়তো এই কয়েকটি দিনই বদলে দিতে পারে একজন মানুষের আখিরাতের ভবিষ্যৎ।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,