আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, যার পেছনে অনুপ্রেরণা ছিল ১৯৯১ সালের উইন্ডহুক ঘোষণাপত্র-স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক আহ্বান। প্রতি বছরের ৩ মে দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-মুক্ত সংবাদমাধ্যম কেবল একটি পেশাগত ক্ষেত্র নয়,এটি গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
সমসাময়িক বিশ্বে গণমাধ্যমের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও জটিল। একদিকে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার সংবাদপ্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে,অন্যদিকে ভুল তথ্য,বিভ্রান্তি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় পেশাদার সাংবাদিকতা ও যাচাইকৃত তথ্যের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউনেস্কো প্রতিবছর এই দিবস উপলক্ষে একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে, যেখানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,নজরদারি প্রযুক্তি এবং অনলাইন হয়রানির বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে-যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নৈতিকতার প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।এবারের প্রতিপাদ্য-'শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার,উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার'।
তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নে দেখা যায়,বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে,সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে শুরু করে শান্তিপূর্ণ দেশেও সাংবাদিকরা হুমকি,হয়রানি এমনকি প্রাণঘাতী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। ফলে ‘নিরাপদ সাংবাদিকতা’এখন বৈশ্বিক এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম দ্রুত বিকাশমান হলেও এখানে পেশাগত স্বাধীনতা,দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার যেমন মতপ্রকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে, তেমনি গুজব ও অপতথ্যের বিস্তারও বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা,তথ্য যাচাই এবং আইনের সুষম প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
মুক্ত গণমাধ্যম মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়; বরং দায়িত্বশীল স্বাধীনতা। এটি এমন এক পরিসর, যেখানে সত্য উদ্ঘাটনের সাহস থাকবে,আবার সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিও শ্রদ্ধা থাকবে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ-সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো-আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত? কারণ, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল তথ্য দেয় না; এটি অন্যায়কে প্রশ্ন করে, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনে এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠকে সামনে তুলে ধরে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি অঙ্গীকার-সত্য, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সম্পাদক-সকালের আলো ডট কম।