পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হতেই শুরু হয়েছে সংখ্যার লড়াই, আর সেই সঙ্গে তুমুল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে বুথফেরত জরিপ। বিভিন্ন সমীক্ষায় যেখানে ভারতীয় জনতা পার্টি এগিয়ে থাকার আভাস দেওয়া হয়েছে, সেখানে তা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-সমীক্ষা নাকি বাস্তব ফল, কোনটি বেশি নির্ভরযোগ্য?
ছয়টি বড় সমীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি বিজেপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে দেখালেও একটি সমীক্ষা পুরো চিত্র উল্টে দিয়েছে। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী তৃণমূলই আবার বিপুল ব্যবধানে ক্ষমতায় ফিরতে পারে। এই দ্বৈত পূর্বাভাস রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সবচেয়ে বড় রহস্য ‘নীরব ভোটার’। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ জনসমক্ষে তাদের পছন্দ প্রকাশ করেন না। এই গোপন প্রবণতা অনেক সময় সমীক্ষায় ধরা পড়ে না, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। অতীতে একাধিক নির্বাচনে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে, যেখানে সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে জয় পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূলের শক্তির জায়গা হিসেবে ধরা হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচি ও নারী ভোটব্যাংক। বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটির অবস্থান মজবুত করেছে। অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বিজেপি জনসমর্থনের ঢেউ তুলতে পারলেও তৃণমূলের মতো শক্তিশালী তৃণমূল স্তরের সংগঠন এখনো গড়ে তুলতে পারেনি।
তবে এবারের নির্বাচনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভোটার তালিকা সংশোধন ইস্যু। বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট কমে গেলে তা নির্বাচনের ফলাফল বদলে দিতে পারে।
এদিকে, সমীক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় এসব জরিপ জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সমীক্ষার ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও এই বিভাজনকে স্পষ্ট করছে। তৃণমূল নেতারা জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হলেও বিজেপির ভেতর থেকেই সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসতে না করার আহ্বান জানানো হয়েছে দলীয় কর্মীদের।
সবকিছু মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করছে-এখানে সমীক্ষা নয়, শেষ কথা বলে ব্যালট। এখন চোখ ৪ মে’র গণনার দিকে, সেদিনই পরিষ্কার হবে সমীক্ষার হিসাব ঠিক, নাকি আবারও চমক দেখাবে বাংলার ভোটাররা।
কী-ওয়ার্ডস: বাংলা নির্বাচন,নীরব ভোটার,সমীক্ষা বিতর্ক