সু ব র্না রা য় স র কা র

  • অভিমানীর শেষ চিঠি
  • ২০২৬-০৪-২৯ ১০:৩৯:০৪
image

প্রিয় ধ্রুবক,
মন খারাপের এই দিনে শুধু তোমাকে বলতে চাই,
আমি পৃথিবীর কাছে এমন একজন মানুষ, যার কাছে পৃথিবীকে দেয়ার মত কিছুই নেই। সম্পর্কের খাতিরে  কাছের মানুষ গুলো তাদের কতটা প্রিয়জন হতে পেরেছি জানিনা। প্রয়োজন বলবো তাও সাহস নেই, আমার আর কিইবা দেয়ার আছে তাদের। শুধু এটুকু বলতে পারি, জীবনে নির্ভেজাল আগলে রাখার একজন মানুষ চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি ভুল প্রমাণ হয়েছি। দুনিয়াটা খুব স্বার্থের। এখানে নোংরা আবর্জনায় ভরে গেছে সবকিছু।
সুন্দর বলতে আর কিছু নেই এখানে। মানুষের মন নেই। মনের সৌন্দর্য নেই।এখানে ভোগ বিলাসে ব্যস্ত সবাই। সুন্দর বলতে মানুষের যে শুদ্ধতা বোঝায় ।এখন আর কেউ শুদ্ধতা খোঁজে না। মন খুঁজে না। ভেজালের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সকল শুদ্ধ চর্চা।
 তবুও বলবো ভালো থেকো ধ্রুবক।
'তোমারই রীমা'
চিঠিটা বুকে নিয়ে শুয়ে আছে ধ্রুবক ।এটাই রীমার দেয়া শেষ স্মৃতি, এই চিঠিটা।ধ্রুবক নিজেও জানে না গত পাঁচ বছরে কতবার পড়েছে এই চিঠি। চিঠিটার ভাঁজে ভাঁজে ছিড়ে গেছে। তবুও পরম যত্নে আগলে রেখেছে সে।শুধু এটা জানে যতবারই চিঠিটা পড়ে ততবারই রিমার মনের কষ্টগুলো নতুন করে অনুভব করতে পারে।
তার চাওয়া গুলো বুঝতে পারে।
রিমার সাথে ধ্রুবকের বিয়ে মাত্র দুই বছরের ছিল ।অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ওদের। কিন্তু রিমার মধ্যে একটা প্রেমিকা সুলভ আচরণ ছিল।রীমাকে দেখলে মনেই হতো না, মাত্র কয়দিন আগে দেখেছিল ।কেমন যেন সারপ্রাইজিং একটা ব্যাপার ছিল ওর মধ্যে। বাড়ির বাচ্চাদের সাথেও এত আন্তরিকভাবে মিশে গেছিল ,অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সবার প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিল সে। ওর বাইরের এত চঞ্চলতা হাসি খুশি থাকা দেখে কখনো বুঝতেই পারেনি ধ্রুবক ভেতরে ভেতরে এতটা ভেঙে গিয়েছিল। নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। সবার মধ্যে থেকেও  ধ্রুবক কে আলাদা করে চাইত রীমা,তার কাছে সময় চাইতো ,যত্ন চাইতে। কোনদিন মুখ ফুটে বলেনি কিছু ।
হয়তো অভিমান  জমে  গিয়েছিল ভীষণ ভাবে। আর ধ্রুবক ও নির্বোধের মত কোনদিন বুঝতে চায়নি ।ও ধ্রুবক কে এভাবে ছেড়ে চলে যাবে কেউ ভাবতেও পারেনি। হয়তো এভাবে ছেড়ে গেল বলেই বুঝলো ও কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই ওদের জীবনে সুখবর এলো।ওরা বাবা মা হতে যাচ্ছে। দুই পরিবারে আনন্দ উল্লাসে ভরে গিয়েছিল। ধ্রুবকের কাছে বিষয়টা ছিল খুব স্বাভাবিক আর প্রাকৃতিক। একটা মেয়ে তার ঘরবাড়ি স্বপ্ন প্রিয়জন সবাইকে ছেড়ে আসার কষ্টটা কোনদিন বুঝতে চেষ্টা করেনি। বোঝার অবকাশ পায়নি। হয়তো এটা ধ্রুবকের নির্বুদ্ধিতাকে আড়াল করার একটা স্বান্তনা মাত্র। 
নির্দিষ্ট দিনে রীমাকে হসপিটালে নেওয়া হলো। ও কান্না ভেজা চোখে ধ্রুবকের দিকে তাকিয়ে ছিল ।ধ্রুবক হাতটা ধরে বলেছিল আমি তো আছি ভয় পেয়ো না। রিমা ধ্রুবকের দিকে অভিমানি চোখে তাকিয়ে ছিল। তার কথা শুনে চোখের জলের গতি যেন আরো বেড়ে গেলো। সেটাই ধ্রুবকের আর রীমার শেষ দেখা । 
যা এখন ধ্রুবকের  বুকে ব্যথার সুর তোলে। রিমা ধ্রুবক কে ছেড়ে চলে গেল ওর অভিমানি চেহারা, ওর ভালোবাসা  সারা জীবনের জন্য অপরাধী করে ধ্রুবক কে একা ফেলে চলে গেল। ওদের কন্যা সন্তান হল। তাকে দিয়ে গেল ওর শেষ চিহ্ন ,শেষ স্মৃতি,হিসেবে।ধ্রুবক মাধুরীকে কোলে নিয়ে রিমার চলে যাওয়া অনুভব করেছিল। রীমা কেন চলে গেলে।তুমি আমি আর মাধুরী  এইতো জীবন আমাদের। তুমি কেন একটু সময় দিলে না। কেন আমাকে বুঝলে না ,আমি তো তোমারই ছিলাম। কেন আমাকে আরেকটু সময় দিলে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ধ্রুবকের গাল গড়িয়ে জল পরছিল। চোখ বন্ধ করে কাঁদছিল ধ্রুবক।
তার চার বছরের ছোট্ট মেয়ে মাধুরী এসে আধো আধো গলায় বলছে,বাবা তুমি কাঁদছো? কেঁদো না বাবা, আমি তো আছি...বাবার চোখের জল মুছে দিল ছোট্ট মেয়েটা। তুমি না আমাকে মা বল!
ধ্রুবক কোন কথা বলতে পারল না, 
শুধু মাধুরীকে বুকে নিয়ে চুপ করে রইল, 
এই অনুতাপ সহ্য করার মতো না।
যা সহ্য করতেই রিমা দিয়ে গেছে ধ্রুবক কে ।
মাধুরীকে পেয়ে ধ্রুবক বুঝতে পেরেছে রীমার প্রতি কি কি অন্যায় করেছিল সে। প্রতিদিন মাধুরীর সাথে  দিন শুরু হয়, রাত হয়, সময় কেটে যায় ধ্রুবকের। কারণ ধ্রুবকের স্বপ্নে জাগরণে, চিন্তায়, মনে, মননে সব জায়গায় রীমা মিশে আছে।