ঢাকায় “শিক্ষা বাজেট: বাজেটের শিক্ষা” শীর্ষক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভা

  • সিজুল ইসলাম
  • ২০২৬-০৪-২২ ১৯:৫৩:৩৫
image

গণসাক্ষরতা অভিযান এর আয়োজনে আজ বুধবার ২২ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, ব্যয় কাঠামো ও নীতিগত অগ্রাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করে “শিক্ষা বাজেট: বাজেটের শিক্ষা” শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণসাক্ষরতা অভিযান-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় শিক্ষা খাতের বিদ্যমান প্রবণতা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন গণসাক্ষরতা অভিযান-এর নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী।
প্রধান অতিথি হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বক্তব্য রাখেন। অংশীজনদের বিভিন্ন দাবি ও সুপারিশের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমরা ধাপে ধাপে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করবো। ৪ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। মিড ডে মিল আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিকের সকল শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি করা ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং নতুন কারিকুলাম নিয়ে সরকার কাজ করছে। আমরা নতুন কারিকুলাম তাড়াহুড়ো করে করব না। নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীরা খেলতে খেলতে শিখবে, গল্পের মাধ্যমে শিখবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গল্পের মাধ্যমে আনন্দদায়ক শিক্ষা পদ্ধতি চালুর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, কোচিং-নোটবুক, গাইড আমরা বন্ধ করবো। তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। শিক্ষাটা হবে ক্যারিয়ার ফোকাস।
একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ, ইএলসিজি বাংলাদেশ এর কো-চেয়ার এবং ব্রিটিশ হাইকমিশন ঢাকার এডুকেশন এডভাইজার মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলর্মী। উন্মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত শিক্ষা খাতের বিভিন্ন অংশীজন শিক্ষা গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়ন সহযোগী, প্রতিবন্ধী শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা বাজেট নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযান-এর উপ-পরিচালক তপন কুমার দাস। শিক্ষা বাজেটের প্রবণতা, বরাদ্দের কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়ন ঘাটতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গণসাক্ষরতা অভিযান-এর উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আব্দুর রউফ বেসরকারি শিক্ষা পরিবারের পক্ষ থেকে গণসাক্ষরতা অভিযান এর ২১ দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি উপস্থাপন করেন। এই ২১ টি দাবির মধ্যে রয়েছে, জাতীয় বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে শিক্ষাখাতে জিডিপি’র অন্তত ২.৫% অথবা জাতীয় বাজেটের ২০% শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ করা। সরকারের প্রথম তিন অর্থবছরে জিডিপি’র ৫% এবং পর্যায়ক্রমে ৫ বছরের মধ্যে ৬% এ উন্নীত করার রূপরেখা প্রণয়ন করা।
এছাড়াও প্রাথমিকে শিক্ষার্থীপ্রতি মাসে ন্যূনতম ৫০০ টাকা, নিম্ন-মাধ্যমিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৭০০ টাকা এবং মাধ্যমিক ও তার ওপরের শ্রেণিতে ১,০০০ টাকা করা, সমন্বিত শিক্ষা আইন করা, শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়ন, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে স্বল্পমেয়াদী কোর্সের ওপর জোর দেয়া, নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান, দূর্যোগপ্রবণ ও দূর্গম এলাকাগুলোতে শিক্ষকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত প্রণোদনা প্রদান, প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, অটিজম ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলগুলোকে সমাজকল্যাণের আওতায় আনা, জাতীয়ভাবে গবেষণার তথ্য সম্বলিত ডাটা ব্যাংক করা, শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ, নোটবই, গাইডবই ও কোচিং বন্ধে উদ্যোগ নেয়া, উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল সর্বজনীন করার জোর দাবি জানানো হয় স্মারকলিপিতে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে কর্পোরেট সোস্যাল রিস্পনসিবিলিটি (সিএসআর)-এর ৩০ শতাংশ ব্যবহার ও এডুকেশন সেইজ Education Cess চালু করা যেতে পারে। প্রতিবেশি দেশ ভারতে এডুকেশন সেইজ (সারচার্জ) প্রবর্তন করে লক্ষাধিক কোটি টাকার ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়েছে। আমরা যমুনা সারচার্জ দিয়ে যমুনা সেতু করেছিলাম সেরকমই এটা।
উক্ত সভায় শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি দেশি-বিদেশি শতাধিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।