সংবিধান নয়,আগে সংস্কার হোক সরকার গঠন পদ্ধতির

  • ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম সামসুদ্দিন
  • ২০২৬-০৪-১৪ ২১:০০:৩৯
image

সময়ের সঙ্গে গণতন্ত্র বহু পথ পেরিয়েছে। কোথাও তা ছিল সরাসরি-মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিত। পরে বড় রাষ্ট্র, বড় জনসংখ্যা আর জটিল প্রশাসনের কারণে জন্ম নেয় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র, যেখানে জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় সংবিধান, আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ধারণা। ফলে গণতন্ত্র আর শুধু ভোটের ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে জবাবদিহি, অংশগ্রহণ ও নাগরিক মর্যাদার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো।
আজকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রেরও নানা রূপ আছে। কোথাও সংসদীয় গণতন্ত্র, কোথাও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা, কোথাও সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা। আবার কোথাও নির্বাচনের আয়োজন থাকলেও গণতন্ত্রের চেতনা দুর্বল। অর্থাৎ গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ব্যালট বাক্সে নয়, বরং মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতিতে।
তাই গণতন্ত্রের ইতিহাস আসলে মানুষের নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস। এথেন্সের ছোট এক নগররাষ্ট্র থেকে শুরু হয়ে আজ তা বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ধারণাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। পথ এখনও অসম্পূর্ণ, চ্যালেঞ্জও কম নয়। তবু গণতন্ত্র বারবার মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ, আর জনগণের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মত, অধিকার ও অংশগ্রহণ।
ডিজিটাল যুগ গণতন্ত্রের সামনে এক নতুন বাস্তবতা হাজির করেছে। ফেসবুক, এক্সসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের পরিসর বিস্তৃত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সত্য ও মিথ্যার সীমানাও ঝাপসা করে দিয়েছে। ফলে গণতন্ত্র এখন শুধু ভোট, দল বা সংসদের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিক সচেতনতা এবং জনমত গঠনের নতুন লড়াইকেও সামনে এনেছে।
এই বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নতুন চিন্তা, নতুন নীতি এবং আরও দায়িত্বশীল নাগরিক চর্চা। কারণ বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব ও পরিকল্পিত অপপ্রচার কেবল রাজনৈতিক পরিবেশই অস্থির করে না, মানুষের পারস্পরিক আস্থাকেও দুর্বল করে। তাই ডিজিটাল সময়ের গণতন্ত্রে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি সত্য যাচাই, সহনশীলতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
আজ গণতন্ত্রের সুরক্ষা মানে কেবল প্রতিষ্ঠান রক্ষা নয়, তথ্যের স্বচ্ছতা রক্ষা করাও। যে সমাজ সত্যকে আলাদা করতে শেখে, ভিন্নমতকে সম্মান করে এবং দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে বিশ্বাসী থাকে, সেই সমাজই পরিবর্তনের এই ঝড়ের মধ্যেও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্বে আবদ্ধ গণতন্ত্র সব সময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। বরং এমন একটি কাঠামো নিয়ে ভাবা যেতে পারে, যেখানে নির্বাচনে প্রথম হওয়া দল সরকার গঠন করবে, আর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দলও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নির্ধারিত ও মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকায় থাকবে। এতে ক্ষমতা কেবল এক পক্ষের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জনগণও দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধকে বাস্তবে দেখার সুযোগ পাবে।
এ ধরনের চিন্তায় একটি নতুন প্রস্তাব সামনে আসতে পারে যা আলোচনার মাধ্যমে আরও যুগোপযোগী করা যেতে পারে—নির্বাচনে বিজয়ী দল প্রথম পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করবে, এর পরপরই বিনা ভোটে পরবর্তী পর্যায়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দল নির্ধারিত দুই থেকে তিন বছরের জন্য সরকার পরিচালনার সুযোগ পাবে। বিরোধী দল সরকার গঠন করলে তারা পূর্ববর্তী সরকারের সমসংখ্যক আসন পাবে সরকার পরিচালনার জন্য। একইভাবে, পূর্ববর্তী সরকার দলটি বিরোধী দলে গেলে তারা আগের সংসদে বিরোধী দলের যে আসনসংখ্যা ছিল সেই সমসংখ্যক আসন পাবে, এবং অন্যান্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আসন অপরিবর্তিত থাকবে।এর ফলে রাজনীতিতে ‘সব অথবা কিছুই নয়’ মানসিকতা কমে আসতে পারে। পরাজিত দলও তখন কেবল প্রতিবাদের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নিজেকে বিকল্প সরকার হিসেবে প্রস্তুত রাখবে। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা হবে দেশের উন্নয়ন, সুশাসন ও জনআস্থার ভিত্তিতে।
এমন ব্যবস্থার একটি বড় সুফল হতে পারে রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি। আজকের বাস্তবতায় সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক বহু সময়েই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু যদি উভয় পক্ষই জানে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরই পর্যায়ক্রমিক ভূমিকা আছে, তবে পারস্পরিক আচরণেও দায়িত্বশীলতা বাড়বে। প্রশাসনও তখন কেবল ক্ষমতাসীনদের নয়, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য হবে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ তখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনবে না, দুই পক্ষের কাজও তুলনা করতে পারবে। কে উন্নয়ন করে, কে স্থিতিশীলতা আনে, কে শান্তি ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করে—সেটি সরাসরি বোঝা যাবে। গণতন্ত্রের আসল শক্তি এখানেই, যেখানে জনগণ সচেতনভাবে বিচার করবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও বুঝবে, ক্ষমতা ভোগের নয়, সেবার বিষয়। সেই উপলব্ধি থেকেই বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, দায়িত্বশীল এবং অংশগ্রহণমূলক এক নতুন গণতান্ত্রিক চর্চার ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ চায় স্থিতিশীলতা, সুশাসন, শান্তি ও অগ্রগতি। তাই গণতন্ত্রের কাঠামো নিয়েও নতুন চিন্তা, নতুন সংলাপ এবং নতুন সাহসী প্রস্তাবের সময় এখনই। যে রাজনীতি বিরোধকে শত্রুতা নয়, বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখতে শেখে, সেই রাজনীতিই দেশকে এগিয়ে নেয়। আর যে গণতন্ত্র জনগণের আশা, আস্থা ও অংশগ্রহণকে আরও বিস্তৃত করে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তারই হাতে নিরাপদ থাকে।


লেখকঃ
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার,আজীবন ফেলো আইইবি ও চীনা বিশেষজ্ঞ
মোবাইল ০১৭১৪১৭৮৩১১ . email ykb@asia.com