দম বন্ধ সময়ে 'দাঁত ভাঙা' হাসি!

  • রীতা রায় মিঠু
  • ২০২৬-০৩-২১ ২১:৩১:২০
image

আজ রাতে ভাত খাওয়ার সময় পাথরের কণা কামড়ে পড়েছিলো, সাথে সাথে শরীরটা সিরসির করে উঠেছিল।
মনে মনে ভাবলাম, আমেরিকায় ডলারে কেনা এত দামী চালেও পাথরের কণা! 
খাওয়া শেষে হাত মুখ ধুয়ে মুখ মুছবার সময় জিভটা ভেতরের পাটির দাঁতে একটু লাগতেই জিভে ব্লেডের ধার টের পেলাম। জিভটা আরেকবার দাঁতে স্পর্শ করে বুঝলাম, উপরের পাটির একটি দাঁত থেকে চিলতে টুকরো ভেঙে গেছে। তাতেই অমন ব্লেডের ধার!
তাহলে ভাতে ওটা পাথরের কণা ছিল না, ছিল দাঁতের কণা!
মনটা খারাপ হয়ে গেলো! চোখ আর দাঁতের প্রতি আমার একটু দুর্বলতা আছেই। 
আমাকে এবড়ো খেবড়ো করে বানাতে গিয়েও ঈশ্বর দয়া পরবশ হয়ে রূপের একটু ছটা দিতে গিয়ে যে দুটো কাজ করেছিলেন, চোখে ভাষা দিয়েছিলেন, আর দাঁতের পাটিতে হাসি দিয়েছেন। 
তাই নিজের রূপ জাহির করতে চোখের তারায় কথা বলা শিখেছি, আর ভোঁতা চেহারার ত্রুটিগুলো হাসি দিয়ে ঢেকে দিতে শিখেছি। এই অল্প নিয়েই আমি খুশি ছিলাম।
কিন্তু ইদানিং সেই খুশিও আর থাকছে না! চোখে দৃষ্টি কমে এসেছে, চশমা দিলেই চোখের ভাষা হারিয়ে যায়! 
বাকি ছিল দাঁত, ধবধবে সাদা দাঁত মেলে হাসি দিলেই আমার সকল কালিমা লুকিয়ে থাকে। সেই দাঁতই কিনা ভেঙ্গে যাচ্ছে। 
আগেও ভেঙ্গেছে কয়েকটা, আজও ভাঙ্গলো! আমি কি তবে এত তাড়াতাড়িই দাঁত ফোকলা বুড়ি হয়ে যাচ্ছি! 
তবুও ভাগ্য ভাল আড়ালে থাকা দাঁতগুলো ভাঙ্গছে! এভাবে কয়দিন! পেছনের পাটির দাঁত ভেঙ্গে শেষ হলেই সামনের পাটির দাঁত ভাঙ্গতে শুরু করবে!
জিভ দিয়ে ভাঙ্গা দাঁতের ধার পরখ করছিলাম, তেমন সময় বন্যার ফোন এলো। দাঁত ভেঙে গেছে শুনে বন্যা বলল, "তুমি বুড়ি হও নাই, তোমার শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব আছে। তুমি ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে পারো না?"।
বন্যার কথা শুনে ভাঙ্গা দাঁত নিয়েই হেসে ফেললাম। 
আমার বড় কন্যা মৌটুসি প্রায়ই বলে, বাংলাদেশে প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি সদস্যই নাকি ছোটখাটো ডাক্তার। আর কিছু নাহোক, সকলেই জানে কখন এন্টিবায়োটিক সিপ্রোসিন খেতে হবে এবং কখন এন্টাসিড খেতে হবে। 
এটা সত্যি কথা। আমি নিজেও ছোটখাটো ডাক্তার, দেশ থেকে বান্ডিল ভরা এমপিসিলিন, এমোক্সিসিলিন কিনে নিয়ে আসি। যখন মনে হলো এন্টিবায়োটিক দরকার, এন্টিবায়োটিক খাই। আর আমার মেজদা তো পকেটে ফার্মেসি নিয়ে ঘোরে। 
বন্যার কথাও মিছে নয়, আমার শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব থাকার কথা। একে তো আমি তৃণভোজী প্রাণী, মাছ মাংস দুধ খাই না বলতে গেলে।
এদিকে বয়স চল্লিশের পর মেয়েদের ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়ার উপদেশ বিনা মূল্যে বিতরণ করি, বিনা মূল্যের উপদেশ নিজে পালন করি না। ক্যালসিয়াম টেবলেটের ভরা বোতল কিনে এনেছিলাম ঠিকই, দুই বছর পার হয়ে ডেট এক্সপায়ারড হয়ে গেছে।
এই কাজটা আমি খুব আনন্দের সাথে করে থাকি, বিনা মূল্যে সদুপদেশ বিলিয়ে যাই। 
সমস্যা হলো যা বিলিয়ে দিতে ভালো লাগে, তা বিলিয়েই শেষ হয়ে যায়, নিজের জন্য কিছু থাকে না।
জিভটা দিয়ে আরেকবার দাঁতের ধার পরখ করলাম। ডেন্টিস্টের কাছে যেতেই হবে। কতগুলো টাকা খসবে! 
আহারে! দাঁত থাকিতে দাঁতের মূল্য বুঝে কয় জনা? দাঁত থাকিতে হাসির মূল্য আমিও বুঝলাম না!
আচ্ছা, এই যে লোকে বলে, দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছি'। 
দাঁত ভাঙ্গা জবাব বিষয়টা কি রকম? কার দাঁত ভাঙ্গে? যে জবাব দিচ্ছে তার দাঁত ভাঙ্গে, নাকি যাকে জবাব দিচ্ছে, জবাব শুনে তার দাঁত ভাঙ্গে?
আমার বেলায় কোনটা হয়েছে? আমি তো একা বসে নীরবে ভাত খাচ্ছিলাম। কারো সাথেই তো কথা বলছিলাম না। নিজেও কাউকে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেইনি, অন্য কেউ আমাকে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার সুযোগ পায়নি। তাহলে দাঁতটা ভাঙ্গলো কেমন করে!
আচ্ছা, দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার ব্যাপারটা পরখ করে দেখা যায় কি! কার উপর এক্সপেরিমেন্ট করা যায়? এতকাল মিথীলা হাতের কাছেই ছিল। গিনিপিগ হিসেবে মিথীলা খুবই ভালো। সব রকম পরীক্ষা ওর উপর দিয়ে করা যায়। 
এখন মিথীলাও হাতের কাছে নেই। গত মাসেও যদি দাঁতটা ভাঙ্গতো, দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার পরীক্ষাটা মিথীলার উপর দিয়েই চালিয়ে দিতাম।
 মিথীলার বাবা আছে ঘরে, দেখবো নাকি মিথীলার বাবার উপর দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার পরীক্ষা করে!
কিন্তু ভাঙ্গা দাঁতের যা ধার রে বাবা, জিভে লাগলেই জিভ ছ্যাঁত করে উঠছে, মিথীলার বাবাকে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে গিয়ে আমি তো ক্যাঁ কোঁ, উঃ মাগো, গেলাম গো' ছাড়া কোন কথাই বলতে পারবো না। 
শেষে উলটো ফল হবে  না তো! ঐ পক্ষ যদি বিগড়ে যায়! আমার আরেকটা দাঁত ভাঙ্গার ব্যবস্থা হবে না তো! তাহলে দাঁত ভাঙা জবাবটা কোন পক্ষে হবে, জবাবটা কেমনই বা হবে!