সিলিন্ডার গ্যাসের লাগামছাড়া দাম: নীরব কর্তৃপক্ষ,চাপা জনস্বার্থ

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০২-০২ ১৯:৪৯:১৫
image

সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ঘটনা নয়;এটি হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক নীরব সংকট। শহর থেকে গ্রাম-রান্নাঘর,চায়ের দোকান, ছোট হোটেল কিংবা রাস্তার খাবারের ভ্যান-সবখানেই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এই দাম বাড়ছে কেন, আর এর দায় কার? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো,এই প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর দেওয়ার মতো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে না।
গত কয়েক বছরে দেশে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সিলিন্ডার এলপিজিই হয়ে উঠেছে কোটি মানুষের একমাত্র ভরসা। অর্থাৎ এটি আর বিলাসপণ্য নয়-এটি নিত্যপ্রয়োজনীয়। অথচ এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে একের পর এক বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ভারসাম্য দুটোই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা হিসেবে প্রায়ই শোনা যায় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই-বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে,ডলার সংকট রয়েছে,পরিবহন খরচ বেড়েছে। এসব যুক্তি আংশিক সত্য হলেও প্রশ্ন থেকে যায়: সব বোঝা কি শুধু ভোক্তাকেই বইতে হবে? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব স্বীকার করাই যায়,কিন্তু সেই প্রভাব কীভাবে,কতটা এবং কোন সময়সীমায় ভোক্তার ঘাড়ে চাপানো হবে-তা কি স্বচ্ছভাবে জানানো হচ্ছে?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। এলপিজির মূল্য নির্ধারণের কাঠামো সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা। আমদানি মূল্য,কর,পরিবহন,ডিলার কমিশন ও কোম্পানির মুনাফা-এই প্রতিটি স্তরে ঠিক কত টাকা যুক্ত হচ্ছে,তার কোনো স্পষ্ট হিসাব জনসমক্ষে নেই। ফলে দাম বাড়লেই সন্দেহ তৈরি হয়-এটা বাস্তব ব্যয় বৃদ্ধির ফল,নাকি নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার সুযোগ?
এর প্রভাব শুধু গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। রান্নার খরচ বাড়ায় খাবারের দাম বাড়ছে,ছোট ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে,শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। অর্থনীতির ভাষায় এটি চেইন রিঅ্যাকশন,আর বাস্তব জীবনে এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির নির্মম বাস্তবতা।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো-এই ইস্যুতে নীতিনির্ধারকদের নীরবতা। কোনো নিয়মিত ব্রিফিং নেই,নেই গণশুনানি,নেই ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যেন কেবল মূল্য ঘোষণা করার দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ,দায়বদ্ধতার জায়গায় নয়। এতে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে,ভোক্তার অসন্তোষ বা কষ্ট নীতিনির্ধারণে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠতেই পারে-গ্যাস যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতেই হয়,তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? সরকার কি অন্তত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কোনো ভর্তুকি কাঠামো ভাবতে পারে না? বা দাম নির্ধারণে একটি সহনীয় সীমা ঠিক করা যায় না? পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই জ্বালানি খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি বা মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল রয়েছে-বাংলাদেশে তা নিয়ে আলোচনা পর্যন্ত দেখা যায় না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে-এলপিজি বাজার কি সত্যিই প্রতিযোগিতামূলক? নাকি কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে নিয়ন্ত্রিত? যদি বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা থাকত,তাহলে মূল্যবৃদ্ধি এত সমানতালে, প্রায় একই সময়ে সব ব্র্যান্ডে দেখা যেত কি না-তা নিয়েও ভাবার অবকাশ আছে।
সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি আসলে সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি পরীক্ষাও বটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে জনগণ অন্তত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়ে বাড়তি প্রত্যাশা রাখে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে এই ইস্যুতে নীরবতা ভাঙতেই হবে।
গ্যাসের দাম বাড়তে পারে-এটা বাস্তবতা। কিন্তু কারণ না জানিয়ে,সমাধানের পথ না দেখিয়ে এবং মানুষের কষ্ট উপেক্ষা করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্তৃপক্ষের এখন দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে জানানো-দাম কেন বাড়ছে,কতদিন থাকবে,এবং সাধারণ মানুষকে এই চাপ থেকে রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
নচেৎ সিলিন্ডার গ্যাসের লাগামছাড়া দাম শুধু রান্নাঘরের আগুনই জ্বালাবে না,জনমনে আস্থাহীনতার আগুনও ছড়িয়ে দেবে-যার পরিণতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট।