তর্কে সত্য বের হয়: নির্বাচনকে সামনে রেখে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয় চর্চা

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০১-১৩ ১৫:০০:২৬
image

নির্বাচন সামনে এলেই সমাজে উত্তাপ বাড়ে। রাজনীতি ঘিরে কথা হয়, বিতর্ক হয়, মতভেদ তীব্র হয়। অনেকেই তখন বলেন-এত তর্ক-বিতর্কের দরকার কী? কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ততই তর্কের প্রয়োজন বাড়ে। কারণ তর্কেই সত্য বের হয়, আর সত্য ছাড়া নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি প্রশ্ন করার অধিকার। নির্বাচন সেই প্রশ্নগুলোকে প্রকাশ্যে আনার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। কে যোগ্য, কে নয়, কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত, কোনটা কেবল স্লোগান-এসব নির্ধারণ হয় তর্কের মধ্য দিয়েই। তর্ক না থাকলে ভোটার শুধু মুখস্থ কথায় বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। আর প্রশ্নহীন বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় ভুল সিদ্ধান্ত।
আমাদের সমাজে তর্ককে প্রায়ই নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। মনে করা হয়, তর্ক মানেই ঝগড়া, বিভাজন কিংবা অস্থিরতা। অথচ সুস্থ তর্ক মানে হলো যুক্তির লড়াই, মতের সংঘর্ষ, যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়-প্রাধান্য পায় তথ্য, বাস্তবতা ও যুক্তিবোধ। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সুস্থ তর্কই নাগরিকদের সচেতন করে তোলে।
নির্বাচনী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়ন,গণতন্ত্র, কর্মসংস্থান,নিরাপত্তা-বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তর্ক ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতির সত্যতা যাচাই হয় না। প্রশ্ন না করলে বোঝা যায় না, উন্নয়নের অর্থ কার জন্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ কোথায়, কিংবা গণতন্ত্রের কথা বলা দল নিজেই কতটা গণতান্ত্রিক। তাই তর্ক এখানে কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব।
তর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক করে তোলা। নির্বাচন মানেই ভিন্নমত থাকবে। সবাই একভাবে ভাববে-এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। কিন্তু যখন ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাজ বিভক্ত হয়। আর যখন তর্কের মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ পায়, তখন সেই বিভক্তি রূপ নেয় আলোচনা ও বোঝাপড়ায়। এতে সহনশীলতা বাড়ে, গণতন্ত্র শক্ত হয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তর্কের পরিসর আরও বড় করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে দায়িত্বহীন বক্তব্য, গুজব ও আবেগনির্ভর বিতর্ক। নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই প্রয়োজন দায়িত্বশীল তর্কের সংস্কৃতি-যেখানে তথ্য যাচাই করা হবে, অপপ্রচার প্রশ্নের মুখে পড়বে, আর সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে।
ইতিহাস বলে, যেখানে প্রশ্ন বন্ধ হয়েছে, সেখানেই অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। আর যেখানে তর্ক জারি থেকেছে, সেখানেই ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে। নির্বাচন সেই সুযোগ এনে দেয়, যখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে পারে-খোলাখুলি, দৃঢ়ভাবে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, তর্ক গণতন্ত্রের শত্রু নয়; নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় হুমকি। নির্বাচনকে সামনে রেখে যদি আমরা তর্ককে ভয় না পাই, বরং তাকে যুক্তি, ভদ্রতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করি-তবেই সত্য বের হবে, আর সেই সত্যই একটি অর্থবহ নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে দেবে।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।