[মোখলেসুর রহমান ১৯২১ সালে রংপুর জেলার নীলফামারী মহকুমার ডিমলা থানার খগাখড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম সিধু মিয়া। তিনি ছিলেন এক বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁদের পরিবার জোতদার হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে তিনি কলকাতা, ঢাকা ও চট্রগ্রামে ছিলেন অনেক দিন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক আন্দোলনে কখনো প্রত্যক্ষ, আবার কখনো পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে তাঁর ভাই মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে বুদ্ধি-পরামর্শ সহযোগিতা করেছেন। একজন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ।
এ সাক্ষাত্কারে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক অ্যাডমিরাল আহসানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শিল্পপতি আমিন ও আদমজীর রাজনৈতিক সম্পর্ক, তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে অবাঙালিদের একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের মূল্যায়ন, ভাসানীর কথা, বিএনপির গঠন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ভাই যাদু মিয়ার সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাদু মিয়ার সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসকি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম।গৃহীত সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতেই বর্ণনা আকারে এ রচনাটি ছাপা হলো। আর প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ছিলেন ইতিহাসবিদ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ।)
পর্ব-৮ (গতকালের পর)
আমাকে বলা হলো, পৃথিবীর যেখান থেকে বলেন, সেখান থেকে ডাক্তার আনা হবে। আমি এত কিংকর্তব্যবিমূঢ় (পাজলড) ছিলাম, কেবল বললাম, ‘ডাক্তার এনে এখন আর কী হবে। এখন তো শেষ অবস্থা।’
যা-ই হোক, পাকিস্তান থেকে আমরা ডক্টর জুম্মাকে, দিল্লি থেকে একজন ব্রেন স্পেশালিস্ট আর কলকাতা থেকে একজন ব্রেন সার্জন—এই তিনজনকে আনালাম।
প্রথমে এলেন ডা. জুম্মা। তিনি এসেই একটা ইনজেকশনের কথা বললেন। ডা. নুরুল ইসলামকে লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘হ্যাভ ইউ পুশ দ্যাট ইনজেকশন?’
ডা. নুরুল ইসলাম আমতা আমতা করতে লাগলেন। তারপর জুম্মা তাঁকে বললেন, ‘ইউ মিন টু সে দ্যাট ইউ হ্যাভ নট পুশড ইট। ডন’ট হ্যাভ ইউ হেয়ার?’ ডা. নুরুল ইসলাম চুপ করে ছিলেন।
এসব কিছু যখন হচ্ছে, তখন আমি সেখানে ছিলাম না। যারা শুনেছে, তারা পরে আমাকে বলেছে। আমি নিজের কানে শুনিনি। ইন্ডিয়ান ডাক্তার এসেও বলেছেন, যাদুর চিকিত্সা ঠিকঠাকমতোই হয়েছে।
এখন কথা হলো যে ওষুধটা কী? আমার মেয়ে ডাক্তার। দিন কয়েক আগে বাচ্চার মা হয়েছে। আমার স্ত্রীও ওখানে ছিল। এই খবর শুনে তারা ফিরে আসে। যাদু মিয়ার মৃতদেহ প্রথমে আমাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। চারটার সময় জানাজা পড়িয়ে সেদিনই আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ওই দিনই তারা বিমান থেকে নামে। এয়ারপোর্টেই ছিল তারা। আমি যাদু মিয়ার লাশটাকে অ্যাসেমব্লি হাউসে নামিয়ে দিয়ে তাদের আনতে গিয়েছিলাম।
বাসায় গিয়ে আমি আমার মেয়েকে বললাম, ‘তোমার চাচার মতো কোনো রোগী যদি তোমার কাছে যায়, তার একটা স্ট্রোক হয়েছে, তখন তোমরা সাধারণত কী করো? ধরো, তখন তুমি ইমারজেন্সিতে আছো। এ রকম একটা রোগী গেল, তখন তুমি কী করবে?’
আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মেয়ে বলেছিল, ‘আমরা ওই ইনজেকশনটা দেব।’
আমি বললাম, ‘কেন?’
মেয়ে বলল, ‘ওই ইনজেকশনটা পুশ করা হবে এ জন্য যে স্ট্রোকটা হয়েছে ব্রেনে। অনেকগুলো সেল আছে তাতে। সেসবের একটাতে স্ট্রোক করেছে এবং রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ইনজেকশনটা যদি স্ট্রোক করার সঙ্গে সঙ্গে পুশ করা হয়, তাহলে তা ছড়াতে পারে না। মস্তিষ্কের আর কোনো ধরনের ক্ষতি করতে পারে না। সবকিছু সীমিত করে ফেলে। তারপর অস্ত্রোপচার করে তাকে আবারও সচল করা যেতে পারে। আমি যতটুকু জেনেছি, তা হলো এই।’
ওই ইনজেকশনটা যাদুকে দেওয়া হয়নি। ডা. নুরুল ইসলামের মতো একজন বিজ্ঞ ডাক্তারের এটা ছিল একটা বিচ্যুতি। এ কথা আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারি না। এই হলো সত্য। সার্বিক সত্য।
২১. সোহরাওয়ার্দী প্রসঙ্গ
এবার একটু প্রসঙ্গান্তরে যাই। তবে এটা আমার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। চল্লিশের দশক থেকেই আমার সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আমি আগে দুই-একটা মিটিংয়ে তাঁর কথা শুনেছি বা গিয়েছি কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় যখন ফজলুল হক সাহেবের শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অবিভক্ত বঙ্গব্যাপী যে আন্দোলন হয়, তাতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবেরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল। এবং তারই নেতৃত্বে আমরা দুটো উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম এবং ওই দুটো নির্বাচনেই ফজলুল হক সাহেবের যে প্রার্থী ছিল, তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
একটা নির্বাচনী কেন্দ্র ছিল বালুরঘাটে, আর একটা নাটোর। ওই দুই নির্বাচনী এলাকায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটা দল নিয়ে কাজ করতে গিয়েছিলাম। ঠিক সে সময়ই তাঁর কাজ করার যে সাংঘাতিক ক্ষমতা, সেটা আমাকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। আমার বয়স তখন তাঁর অর্ধেকেরও কম। আমরা ১৬ ঘণ্টা, কখনো বা ১৮ ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে নির্বাচনী সফর করতাম। যেতে যেতে আমরা বলতাম, ‘চলুন, আমরা এখানে নেমে যাই। সামনের ডাকবাংলোয় নেমে যাই।’ কিন্তু উনি তাঁর ওই চাদরের খুঁটে রাখা ঝালমুড়ি খাচ্ছেন আর একইভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। করে চলেছেন নির্বাচনী সফরের কাজ। থামাথামি নেই। একনাগাড়ে ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা এই যে তাঁর অদ্ভুত কাজ করার ক্ষমতা, এটা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং আমি মনে করি যে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের যে বিজয়, শুধু বিজয় না, এটাকেই পাকিস্তান কায়েমের মূল শক্তি জুগিয়েছিল, সেই বিজয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি যদি কারও অবদান থেকে থাকে, তাহলে সেটা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। কিন্তু ইতিহাসের এটাই পরিহাস যে সেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই ‘রানিং ডগস অব দ্য হিন্দুজ’ বলে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলতে গেলে এই সময়ই আমি আরও বেশি করে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আকৃষ্ট হই। এবং তিনি ওই যে তাঁর বাড়িতে পেছনের দিকে খাটিয়ায় শুয়ে থাকতেন, ওখানে গিয়ে তাঁকে জাগিয়ে কথা বলার অধিকার আমার ছিল।
মাঝেমাঝেই আমি একটা ব্যাপারে ভাবতাম যে উনি আমার একটা ক্ষতি করেছেন। এখন অবশ্য আমি তেমন কিছু ভাবি না। ১৯৪৫ সালে আমাদের নীলফামারী নির্বাচনী এলাকায় একটা বাই ইলেকশন হয়। তাতে আমি প্রার্থী হই। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার প্রার্থিতার বিরোধিতা করেন এবং আমাকে নমিনেশন না দিয়ে স্যার এম রহমানকে নমিনেশন দেন। স্যার এম রহমান ছয় মাস পরে মারা যান এবং আমি ওই সময় খুব মনঃক্ষুণ্ন হয়ে, হতাশ হয়ে কলকাতায় চলে যাই। এক মাসের বেশি আমার এলাকার বাইরে থাকি। ইতিমধ্যে নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারিনি বলে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আমাকে আগামী পাঁচ বছর নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়। তখন মনে হয়েছিল যে আমার একটা সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে গেল কিন্তু এখন মনে করি যে ক্ষতি হয়নি। কারণ, আমার সমসাময়িক যাঁরা মুসলিম লীগে ছিলেন, পলিটিক্যাল ফোর্স হিসেবে এখন আর তাঁদের কেউই বেঁচে নেই। আমি কিছু হতে পারিনি সত্যি কিন্তু তবু মনে করি, আমি এখনো রাজনৈতিকভাবে জীবিত। এখন আর মনে করি না যে এ কারণে আমার একটা ক্ষতি হয়েছে।
বস্তুত শহীদ সাহেব ছাড়া মুসলিম লীগের ১৯৪৬-এর যে বিজয়, সেটা সম্ভব হতো না। কিন্তু যখন প্রশ্ন উঠল যে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতা হবেন কে? সেখানে তিনি নির্বাচিত হতে পারলেন না। নির্বাচিত হলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। এমনকি কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে এলে তাঁকে স্টিমার থেকে নামতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। আমি খবরটা আগেই পেয়েছিলাম এবং একটা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে ওই স্টিমারে উঠে যাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর কেবিনে ছিলেন। তাঁর পাশে যে রেস্তোরাঁ ছিল, আমি সেখানে গিয়ে বসি। একসময় তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে আসেন এবং রেস্তোরাঁয় আমাকে ওখানে বসে থাকতে দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান।
বললেন, ‘আরে মোখলেস, তুমি এখানে?’
আমি বললাম, ‘স্যার, আপনাকে তো সবাই ছেড়েছে, আমি আপনার সঙ্গে না এসে আর পারলাম না।’ আমার এ কথা শোনার পরপরই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের চোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে।
দুজনে মিলে অনেক কথা বললাম। ১৯৪৬-এর উপনির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দিতে পারেননি বলে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন।
যা-ই হোক, আমি এটুকু বলতে চাই যে পাকিস্তান মুসলিম লীগে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান অতুলনীয়। এ রকম একজন মানুষকে নিগৃহীত হতে দেখে আমার সেদিন খুব খারাপ লেগেছিল। বলতে পারেন, এর প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ আমি তাঁর সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে যেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল ফজলুর রহমান সাহেবের, তেমনি শহীদ সাহেবেরও। তাঁরা দুজনই ছিলেন ভিন্ন শিবিরের লোক। কিন্তু পরে তাঁরা আবার এক শিবিরে এসে মিলিত হয়েছিলেন।
ফজলুর রহমান সাহেব ১৯৪৬-এর নির্বাচনের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায় যোগ দেন রাজস্ব ও জেলসংক্রান্ত মন্ত্রী হিসেবে। তবে ’৪৭ সালে পার্টিশনের একটু আগেভাগে সোহরাওয়ার্দী-শরত্ বসু যুক্তবঙ্গের যে আন্দোলন হয়, সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। আমার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই।
২২. মুক্তিযুদ্ধ—১৯৭১ পর্ব
আওয়ামী লীগের সঙ্গে যেসব ছাত্র-কর্মী বা যুবকর্মী ছিলেন, পঞ্চাশের দশকের গোড়ার থেকেই তাঁঁরা মোটামুটিভাবে মুক্তচিন্তার অধিকারী ছিলেন। তাঁরা পাকিস্তান, আমেরিকার সঙ্গে বা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত হোক, সেটা তাঁরা চাননি। কিন্তু শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ঢাকায় এসে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে খুব জোর ওকালতি করার কারণ সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলতে পারব না। তবে আমি অনুমান করতে পারি যে অমনটা করা না হলে ক্ষমতায় আসা যেত না।
এ দেশে যখন গণ-আন্দোলন হয় এবং যখন মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন শাহ আজিজুর রহমানের যে ভূমিকা দেখা গেছে, সেটা চলমান গণ-আন্দোলনের পক্ষেও নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও নয়।
আটষট্টি থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত যাদু মিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় যে ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাঁদের একটা সমঝোতা হয়েছিল। ইয়াহিয়া সেই সমঝোতার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। পাত্তা দেননি। সে কারণে যাদু মিয়া রাগ করেছিল। সেই রাগ-অভিমান থেকে ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে কথা বললে ইয়াহিয়া তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেন। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর যাদু মিয়ার রাজনীতিটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট ছিল না। তখন তার রাজনৈতিক নানা প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য দেখা দেয়।
একাত্তর সালে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তাও জানি না। কিন্তু যখন মার্চের ওই গোলযোগটা আরম্ভ হলো, তখন আমি তাকে খোঁজ করে বের করি। কারণ, আমার একটা ভয় ছিল যে সে পাকিস্তানিদের হাতে পড়ে যেতে পারে এবং তাকে দিয়ে পাকিস্তানিরা অনেক কুকাজ করাতে পারে। সে জন্য আমি তাকে খুঁজে বের করি।
সে আত্মগোপন করেছিল। সেখান থেকে তাকে আমি খুঁজে বের করি। ওই সময় আমরা গুলশান হয়ে লোকজনকে পার করে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করেছিলাম। ওখান থেকেই অনেক বড় বড় লোককে পার করিয়ে দেওয়া হয়।
যা-ই হোক, আমি যাদু মিয়াকে গুলশানে নিয়ে আসি তাকে ওখান দিয়েই পার করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু যেদিন বিকেলবেলা তাকে পাঠাব, সেদিনই গুলশান লেকের ওপারে, বাড্ডায় আর্মিরা চড়াও হয়। আমরা একটা বাড়ির ছাদ থেকে ব্যাপারটা দেখেছিলাম। আমি যখন যাদুকে বোঝাচ্ছি এই রাস্তা দিয়ে তুমি যাবে, ঠিক তখনই ওখানে গোলমালটা শুরু হলো। তাতে করে সে ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি যাব কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে যাব না।’ তারপর সে অন্য রাস্তা দিয়ে আরিচাঘাট হয়ে কলকাতায় যায় এবং সেখানে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ-ওয়ালাদের সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি।
বস্তুত যাদু মিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে তাদের মনোভাব খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। ওই সময় আমি যেহেতু কলকাতায় ছিলাম না, সে কারণে তার ভূমিকা সম্পর্কে আমি ঠিকঠাকমতো কিছু বলতে পারব না। তবে তার জীবনের ওপর আঘাত আসতে পারে—এ রকম একটা ভয় ছিল এবং সে ভয়ের জন্য যাদু মিয়া আবার দেশের ভেতরে ফিরে আসে এবং ফিরে এসে আমাদের দেশের বাড়িতে গেলে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়ে তা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তাতে অনেক লোকজন মারা যায় এবং যাদু মিয়াকে পাকিস্তানি সেনারা ওখান থেকে ধরে নিয়ে আসে। নিয়ে এসে তারা তাকে সৈয়দপুর সেনানিবাসে আটকে রেখেছিল বলে শুনেছি। এই সময় তারা তার কাছ থেকে একটা বিবৃতি লিখিয়ে নেয়। সেটা পরে নাকি রংপুর বেতার মারফত প্রচার করা হয়েছিল।
অবশ্য, এসবই আমার শোনা কথা। আমি সম্যক কিছু জানি না। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাও করিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের দিকে যাদু মিয়া ঢাকায় আসে। আসার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী শেখ মুজিবের ওপর যাদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। যাদু মিয়া এবং শেখ মুজিব আসলে খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। ফার্স্ট ফ্রেইন্ড বলতে যা বোঝায়, তা-ই ছিলেন তাঁরা। এই সময় আমার কাছে একটা খবর এল (একজন দায়িত্বশীল নেতাই তিনি) আমাকে এসে জানালেন যে, তিনি শেখ সাহেবের ওখানে বসে ছিলেন। তখন কয়েকজন লোক শেখ সাহেবকে বলতে শোনেন যে, মশিউর রহমান তো এখন ঢাকাতেই আছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হোক। জবাবে শেখ সাহেব বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, সে হবে।’ তিনি এ রকম কিছু কথা বলে তাঁদের তুলে দিলেন।
আমি যাদুকে এসে বললাম, ‘তুমি ঢাকায় এসে বসে আছো কেন? তোমাকে নিয়ে তো এ ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। তুমি একটু সরে থাকো।’ আমার এ কথা শোনার পর আমাকে অবাক করে দিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন তুলে শেখ মুজিবের নাম্বারে ডায়াল করে। লাইন পেয়ে যেতেই সে শেখ মুজিবকে বলে, ‘এই... তুই নাকি আমাকে অ্যারেস্ট করবি!’
ওদিক থেকে মুজিব কী বলেছিলেন, আমি জানি না, কিন্তু দুজনের মধ্যে খুবই হাসি-ঠাট্টা হয়েছিল সেদিন। যা-ই হোক, অনেক দিন পর্যন্ত শেখ মুজিব জানতেন যে যাদু মিয়া ঢাকায় আছে। কিন্তু দলের চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাকে গ্রেপ্তার করেননি।
পরে যাদু মিয়া যখন উত্তেজিত হয়ে এ রকমের একটা উক্তি নাকি করেছিল যে ‘আমি কদিনের মধ্যেই এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারি,’ কেবল তখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের কথা এসব।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যাদু মিয়া তো জানতেন যে মুক্তিযুদ্ধে শাহ আজিজুর রহমানের কী ভূমিকা ছিল, তেমন একজন লোককে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার জন্য তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, এটা অন্য কোনো কারণে নয়। সে জিয়াকে কথা দিয়েছিল বলেই শাহ আজিজকে সেখানে ভিড়িয়েছিল। তার নিজেরও একটা ইচ্ছা বা আকঙ্ক্ষা ছিল। এ দুটো প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়েই তাদের আনতে হয়েছিল। বস্তুত জিয়াউর রহমানকে যাদু মিয়া এই বলে কথা দিয়েছিল যে মুসলিম লীগের তার পুরোনো বন্ধুদের জিয়ার দলে আনতে হবে এবং শাহ আজিজুর রহমান মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন বলেই তাঁর সাহায্য নিয়ে তাঁর সেই মুসলিম লীগারদের আনতে হয়েছিল। কাজটা করতে গিয়ে যাদু বিচার করেনি, কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর বিপক্ষে কারা ছিল। আসলে যাদু মিয়া তার লক্ষ্য সাধন করতে চেয়েছিল।
২৩. ফজলুর রহমান/শেরে-বাংলা প্রসঙ্গ
একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও ফজলুর রহমান সাহেব সম্পর্কে, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আমাকে একটু বলতে হবে।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দু-এক বছর পর আমার মনে হয়, উনচল্লিশ সাল থেকে তাঁর সংস্পর্শে আসি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে বেঙ্গল অ্যাসেমব্লিতেও সদস্য। সে সময় ঢাকায় একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছিল। মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় সর্বতোভাবে তিনি কাজ করতেন। এর একটা উদাহরণ দিই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের যখন তিনি সদস্য, তখন মুসলমান শিক্ষক যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের চাকরি পাওয়ার পেছনে ফজলুর রহমান সাহেবের একটা অবদান ছিল। এবং এমনও দেখা গেছে যে একজন সুপিরিয়র অ্যান্ড বেটার কোয়ালিফিকেশনের হিন্দু ক্যান্ডিডেট আর লেসার কোয়ালিফিকেশনের একজন মুসলিম ক্যান্ডিডেট—এই দুজনের ভেতর থেকে মুসলমান ক্যান্ডিডেটটিকেই ফজলুর রহমান সাহেব অনেক সময় নিয়োগ দিতে পেরেছেন।
এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং যাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, উভয়ের সুনাম সে রকমভাবে রক্ষা না করা গেলেও তিনি মুসলমান ক্যান্ডিডেটকে নিযুক্ত করতে পেরেছেন। আমি মনে করি যে মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যত রকমভাবে কাজ করা সম্ভব তিনি তার সবই করেছেন। এই সময়জুড়ে ফজলুর রহমান সাহেবকে আমি এভাবেই দেখেছি।
আমার রাজনীতিসম্পৃক্ত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আপনাদের আমি বলেছি। আমি একটা অসাম্প্রদায়িক মানুষ হলেও রংপুর কলেজে এসে শ্রীপদ্ম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুর রহমানের মতো মানুষদের সংস্পর্শে এসে আমি মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানবাদের আদর্শে উজ্জীবিত হই। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় শুধু নয়, বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্কও ছিল। তাঁরা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমার নিজের দিক থেকে বলব যে আমি তাঁদের আমার অভিভাবক বলেই মনে করতাম। বিশেষ করে, ফজলুর রহমান সাহেব ও মওলা মামাকে। ফজলুর রহমান সাহেব মওলা মামার বাসাতেই থাকতেন এবং তাঁরা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমিও তাঁদের দ্বারা অনেক ব্যাপারে প্রভাবিত হয়েছি। আমি তো কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত না থাকলেও এই যে আমার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক চিন্তা করার ক্ষমতা, তার হাতেখড়ি তাঁদের কাছ থেকেই। কোনো সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করার পর একটা সিদ্ধান্ত টানার যে ক্ষমতা, এও আমার তাঁদের কাছ থেকেই পাওয়া।
বাঙালি স্বার্থ এবং মুসলিম স্বার্থ রক্ষা করার জন্য করাচিতে আমি ফজলুর রহমান সাহেবকে অনেক কিছু করতে দেখেছি। তাঁর আরবি হরফ প্রচলন করার ব্যাপারে যে কথা বলা হয়ে থাকে, তার মূলে ছিল তাঁর ঘোর পাকিস্তানি হওয়ার ব্যাপার। কায়েম হওয়া পাকিস্তান কী করে রক্ষা করা হবে, সেই লক্ষ্যে তাঁর একটা ভাবনা ছিল। এ জন্যই দু-একটা ক্ষেত্রে তাঁকে আপনারা মনে করতে পারেন যে বাঙালি স্বার্থ কিংবা বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিল না। কিন্তু তাঁর চরিত্রে সাংঘাতিক একটা জিনিস ছিল এবং সেটা বোধ হয় ভৌগোলিক কারণেই হয়েছিল।
আমাদের উত্তরবঙ্গে বাড়ি কিন্তু আমরা অতখানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারিনি। ফজলুর রহমান সাহেব অনেক উদ্ভট পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারতেন। বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন। চর অঞ্চলের লোক ছিলেন তো, পদ্মার চরের লোক হিসেবে সাংঘাতিক একটা একরোখা মনোভাব ছিল তাঁর। এটা আমার মধ্যে নেই। আমি তাঁর মধ্যে আর একটি জিনিস দেখেছি যে পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো বুকের পাটা আর কারোর ছিল না।
আমি একমাত্র ফজলুর রহমানের নাম করতে পারি, বাঙালিদের মধ্যে যতজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন, ফজলুর রহমান ছাড়া অন্য কেউ পাঞ্জাবিদের সামনে মুখ খুলতে পারেননি।
কোরীয় যুদ্ধের পর গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী, তিনি চাচ্ছিলেন মুদ্রার অবমূল্যায়ন। ফজলুর রহমান সাহেব বলেছিলেন যে অবমূল্যায়ন নয়। এ কারণে গোলাম মোহাম্মদ ও ফজলুর রহমানের মধ্যে একটা তিক্ত সম্পর্ক চলছিল।
ফজলুর রহমান সাহেবের যুক্তিটা ছিল এ রকমের যে আমরা হচ্ছি প্রাথমিক কমোডিটির রপ্তানিকারক, মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে আমাদের কোনো লাভ হবে না এবং গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবিচার করছিলেন বলে আমি ফজলুর রহমান সাহেবের বাড়িতে তাঁর প্রণীত বাজেটের ওপরে কাট মোশান দেখেছি এবং দ্যাট কাট মোশান প্রস্তাব করেছিলেন নুরুল আমিন।
সেই কাট মোশানটা নেওয়ার সময় লিয়াকত আলী খান বলেছিলেন, ‘মোশানটা আসতে পারবে না, আমরা সংসদের বাইরে ব্যাপারটার মীমাংসা করব।’ এগুলো আমি করতে দেখেছি। কাজেই বাঙালি স্বার্থ তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন—ভাষার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকার বিচারে সে কথা আপনারা বলতে পারেন। সংস্কৃতি বা কালচারের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকার বিচারে এ কথা হয়তো বলতে পারেন, কিন্তু তিনি মূলত বাঙালি ছিলেন এবং বাংলা ভাষা তাঁর নিজেরও ভাষা ছিল কিন্তু তিনি ছিলেন এই পাকিস্তান রক্ষা করা এবং পাকিস্তানের অখণ্ডত্ব রক্ষা করার জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন। এ জন্যই তাঁর সম্পর্কে অনেক সময় অনেকের এ রকমের একটা ধারণা হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি যে তিনি একজন বাঙালি ছিলেন এবং বাঙালি স্বার্থ জলাঞ্জলি দেননি।
আরেকটা জিনিস বলব যে ফজলুর রহমান সাহেব সবকিছু সত্ত্বেও এই যে ফাতেমা জিন্নাহ যে প্রার্থী হয়েছিলেন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, এ জন্য একজনই দায়ী ছিলেন, তিনি ফজলুর রহমান। কারণ, আইয়ুব খান যখনই তাঁর সংবিধানটা গ্রহণ করলেন, তখন থেকেই ফজলুর রহমানরা জানতেন যে আইয়ুব প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য নির্বাচনটা করবেনই।সূত্র-প্রতিচিন্তা।।
(চলবে)