ঢাকা এখন অদ্ভুত এক ঋতুতে দাঁড়িয়ে। বাতাসে কুয়াশা নেই, তবু জানালায় জল জমে।
রাস্তায় নামলেই গায়ে লেগে যায় এক নিঃশব্দ ঠান্ডা, যেটা শরীরে নয়—থাকে চামড়ার নিচে, কথার ভিতরে।
সাজিদ মুনতাসীর হোণ্ডা চালায় যেন কারও কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
নীরা পেছনে বসে হালকা হাওয়ার কানে চিৎকার করে ওঠে,
— “আস্তে চালা! আমি পড়ে গেলে ফেসবুক রিল হয়ে যাবো। ভাইরাল ট্র্যাজেডি।”
সাজিদ হেসে বলে,
— “তুই এমনিতেই তো রিল।
সময় তোকে স্কিপ করে দেয়, যেমন আমরাও স্কিপ করি বিজ্ঞাপন।”
ওদের কথাগুলো এমন, যেন গতি দিয়ে লেখা।
হালকা ধোঁয়ায় ঢাকা শহরটা ওদের পেছনে চলে যায়,
আর সামনে পড়ে থাকে কিছু আলো, কিছু অর্ধেক বাক্য,
আর থেমে থাকা ট্রাফিক সিগনালে আটকে থাকা নীরবতা।
ধানমন্ডির কফিশপের ধোঁয়ার ভেতর সাজিদ বলে,
— “আলকেমিস্ট আসলে গ্লোরিফায়েড হ্যালুসিনেশন।
ভাষা তো যেন পোস্টার—ভিতর ফাঁপা।”
নীরা চোখ সরিয়ে তাকায় জানালায়।
— “আমার বরং হাসনাত আবদুল হাই ভালো লাগে।
তার গদ্যে সম্পর্ক আসে কুঁচকে যাওয়া কাপড়ের মতো—
জল লাগলে আবার প্রসারিত হয়।”
সাজিদ ঠাট্টা করে,
— “তুই বুড়া হইছিস, রে?”
— “আর তুই shallow।
তোর প্রেম GIF-এর মতো—নড়াচড়া আছে, মুগ্ধতা নেই।”
ওদের হাসি শব্দের চেয়ে দীর্ঘ হয়,
কিন্তু শব্দ শেষ হয় আগে।
ভাষা ঘুরে ফিরে এক বৃত্তে বাঁধা পড়ে,
যেখানে আবেগ ধাক্কা খায়, কিন্তু শব্দে ধরা পড়ে না।
মোহাম্মদপুরের গলিপথে দিয়ে যাচ্ছিল ওরা।
হঠাৎ সাজিদ হোণ্ডার গতি কমিয়ে বলে,
— “দেখ! একটা প্রজাপতি! কী অদ্ভুত রঙ!”
নীরা তাকিয়ে বলে,
— “এই রঙটাই শেষ হবে কয়েকদিনে।
প্রজাপতির আয়ু মাত্র দুই সপ্তাহ।”
সাজিদ থেমে যায়।
— “তবু দেখ, কত সুন্দর।”
নীরা কাঁধ ঝাঁকে।
— “সৌন্দর্য যদি থাকেও, তার স্থায়ীত্ব না থাকলে কী যায় আসে?”
আলোর নিচে প্রজাপতির ছায়া পড়ে হোণ্ডার হেডলাইটে।
মুহূর্তকাল সেদিকেই তাকিয়ে থাকে ওরা।
তারপর আরেকবার গতি নেয়।
শহর হঠাৎ স্লিপ করে।
পাতলা বৃষ্টির মধ্যে হোণ্ডা ছুটছিল,
একটা বাঁক ঘুরতেই—
একটা মেয়ে রাস্তার ধারে হাঁটছিল।
ধাক্কাটা খুব হালকা ছিল,
তবু শব্দটা যেন কেঁপে উঠেছিল ভিতরে।
মেয়েটি পড়ে যায়। শাড়ির আঁচল একপাশে ছিঁড়ে।
মুখে ময়লা লেগে আছে, চোখে ঘোলাটে কিছু,
কিন্তু চেহারায় এমন এক শান্তি যেন দুঃখ নিজে হাতে এঁকেছে মুখখানা।
সাজিদ ছুটে গিয়ে ধরে তাকে।
— “আপনি ঠিক আছেন?”
মেয়েটি তাকায়, কিছু বলে না।
চোখে কুয়াশার মতো নীরবতা।
ছোট এক গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নেয়া হয় মেয়েটিকে।
ডাক্তার বলে, "মাথায় সামান্য আঘাত। ভয় নেই।"
নীরা চুপ।
সাজিদ ফর্ম পূরণ করছিল।
— “নাম?”
— “রুবানা।”
এই নামটা উচ্চারণ করতেই যেন বাতাসের ভেতরে শব্দ থেমে যায়।
সাজিদ বলে,
— “আপনার বাসা কোথায়?”
রুবানা বলে,
— “বাসা তো এখন হাসপাতাল।
বাসায় কেউ নেই। বাবা রিকশা চালায়, মা চলে গেছে।”
নীরার চোখ শক্ত হয়ে ওঠে।
সে বোঝে, সাজিদের চোখে রঙ বদলাচ্ছে—
আর সেটা শহরের আলো থেকে নয়,
রুবানার মুখের ছায়া থেকে।
সাজিদ রুবানার কাছে আরও একদিন যায়।
তারপর আরেকদিন।
নীরা বিরক্ত হয়,
— “তুই guilt carry করিস, না প্রেম খেলতে চাস?”
সাজিদ বলে না কিছু।
তার চোখে তখনো রুবানার সেই মুখ,
যেটা বৃষ্টির ঠিক আগমুহূর্তের মতো—
চেনা, অথচ একরকম অস্বস্তির আবেশ।
নীরা বলে,
— “সব গরিব মেয়ের চোখেই কথা থাকে।
তুই কথা শোনার অভিনয় করিস না।”
সাজিদ চুপ।
তার মনের ভেতর একটা শব্দ ঘুরপাক খায়:
"থাকার মতো কেউ থাকেনি, আর যাওয়ার মতো কেউ আসেনি।"
ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে আছে ওরা।
রাত গভীর হতে থাকে , বাতাসে শব্দ নেই।
নীরা বলে,
— “তুই কি রুবানার প্রেমে পড়ছিস?”
সাজিদ বলে,
— “না। কিন্তু ওর মুখটা ভুলতে পারছি না।”
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
— “জীবনটা একটা draft গল্প—যেখানে একবার শব্দ কেটে দিলে আর ফিরে আসা যায় না।
তুই কি আমাকে ভালোবাসিস?”
সাজিদ চুপ।
— “তুই আমার গন্তব্য,” সে বলে।
— “কিন্তু মাঝপথে কিছু মুখ থাকে,
যেগুলা না ছুঁইলে পথটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে।”
নীরার চোখ গরম হয়ে ওঠে।
— “তুই সেই ফাঁকার দিকেই যা। আমি থাকবো না।”
সাজিদ মাথা নিচু করে।
তার ভেতরে একটুকরো আলো ডানা মেলে—কিন্তু উড়তে পারে না।
রুবানা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায়।
সাজিদ আর যায় না।
শুধু আনোয়ার নামে এক ওয়ার্ডবয়ের হাতে খাম দিয়ে আসে।
তাতে লেখা—
"রুবানা,
তোমার চোখে এখনো এমন কিছু ফুটে,
যা আমি দেখি, কিন্তু ছুঁই না।
আমি থাকবো না,
তুমি থেকো।
এই শহরে একদিন প্রজাপতি মরবে,
তুমি নও ।"
পরদিন সকাল।
সাজিদ আর নীরা আবার হোণ্ডায় ওঠে।
কিন্তু এবার আর গতি নেই।
নীরব ছন্দে চলে হোণ্ডা,
শহর আর আলোর ফাঁকে ফাঁকে ওদের মধ্যে জমে ওঠে
একটি অসম্পূর্ণ ক্ষমা।
নীরা বলে,
— “তোর কি মনে হয়, আমরা ভালোবাসতে শিখলাম?”
সাজিদ বলে,
— “ভালোবাসা মানে থেমে থাকা।
একই জায়গায় আবার ফেরত আসা,
যেখানে একদিন কিছু থেমে গিয়েছিল।”
হোণ্ডার পেছনে ছোট্ট একটা প্রজাপতির ক্লিপ দুলছিল।
হাওয়ায় ছায়া ফেলছিল রাস্তায়, ঠিক যেমন ছায়া পড়ে কোনও সম্পর্কের,যা শেষ না হয়ে স্থির হয়ে যায়।