বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল জাতিসংঘ মানবাধিকার মিশন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৫-০৭-১৯ ০০:৩২:২৮
image

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করল জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের (UNHCHR) একটি পূর্ণাঙ্গ মিশন। শুক্রবার (১৮ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের মধ্যে তিন বছরের একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সইয়ের মাধ্যমে মিশনের পথচলা শুরু হয়।
ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এর একদিন আগে, অর্থাৎ ১৭ জুলাই বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম সভা, যেখানে এই মিশনের কার্যক্রম অনুমোদন পায়। জানা গেছে, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের লক্ষ্যে মিশনকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই নতুন মিশনের অধীনে জাতিসংঘ:
মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি সহায়তা দেবে
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের মধ্যে মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ চালাবে
মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে
সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে
গত বছরের আগস্ট থেকেই জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণবিক্ষোভ ও ক্ষমতার রদবদলের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠে আসে, যার উপর জাতিসংঘ দপ্তর ফিল্ড পর্যায়ে তথ্য অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে।
জাতিসংঘ মনে করে, বাংলাদেশ এখন একটি ‘সংবেদনশীল উত্তরণের সময়’ অতিক্রম করছে। এ সময়ে মানবাধিকার নিশ্চয়তার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন, গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার মিশনের কাজ হবে মূলত চারটি স্তরে:
প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:
পুলিশ, বিচারক, প্রশাসক, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজকে মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া
তথ্য পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন: মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি
সংবাদ ও সজাগতা বৃদ্ধি: মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, মিডিয়া ক্যাম্পেইন
পরামর্শ ও আইন সংস্কার সহায়তা: মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন বা সংস্কারে পরামর্শ দেওয়া
মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মিশনের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনই একটি বিচারযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার চাপে রাখার কৌশলও বটে।
বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “জাতিসংঘের এই মিশন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনবান্ধব ও মানবিক করতে পারে-এটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে মানবাধিকার রক্ষায় সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের সঙ্গে আমাদের এই সহযোগিতা সেটিই প্রমাণ করে।”
অন্যদিকে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই মিশনের কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হবে, তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এই চুক্তি ও মিশনের যাত্রা বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার সূচনা, তেমনি এটিকে আত্মসমালোচনার আয়না হিসেবে দেখারও সময় এসেছে। জাতিসংঘের এই উপস্থিতি কেবল ‘কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা’ না হয়ে যেন গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্রের বাস্তবভিত্তিক রূপান্তরে সহায়ক হয়-এটাই এখন সময়ের দাবি।

কিওয়ার্ডস:

#জাতিসংঘমানবাধিকারকমিশনবাংলাদেশ
#UNHCHRমিশন২০২৫
#ফলকারটুর্কঢাকা
#মানবাধিকারচুক্তিবাংলাদেশ
#জাতিসংঘমিশনওমানবাধিকার #HumanRightsBangladesh