নৈতিক অবক্ষয়:সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়ছে নৃশংসতা-হুমকির মুখে পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা

  • সরদার কালাম এস'কে'পি।
  • ২০২৫-০৭-১৩ ১৫:২৬:০০
image

নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অবক্ষয় বর্তমান বাঙালি সমাজ সভ্যতায় সবচেয়ে বড় সমস্যা। যার অন্যতম কারণ বাঙালি সংস্কৃতি হিংসার সংস্কৃতি আর তা প্রতিটি মানুষ স্বীকার করলেও মানছেন না সিংহভাগই।
পরিবেশ পরিস্থিতি প্রমাণ করে সুবিধাদর্শন আর সুবিধামতে সবাই যেন যার যার মতাদর্শ ও যায়গা থেকে ঠিকই আছে, সবাই নির্ভুল এবং সঠিক পথেই আছে।যা আমিত্ববাদ আর স্বার্থপরতা অসুস্থতার লক্ষ্যন।অপরাধ স্বীকার করাত দূরের কথা সামাজিক অবক্ষয় তথা অপরাধ দমন এবং রোধে ব্যর্থতা-অপারগতাও স্বীকার করতে নারাজ সবাই।সবাই অপরাধের প্রতিবাদে সোচ্চার তবুও ঘটছে একইভাবে সব অমানবিক ঘটনা।
একপ্রকার সমাজ থেকে যে বিবেক মনুষত্ব্য মানবিকতাও লোপ পেয়েছে তা কেউ টেরই পাচ্ছে না।নৈতিকতার অভাবে সামাজিক মূল্যবোধ আর মনুষত্ব্যের উপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে অবশেষে যার যার পক্ষেই সঠিক পথেই হাটছে। আর এমন মনোভাবের ফল্স্রতিতে আমরা এখন একটি অস্থির সময় পার করছি।দেশে প্রায়ই ঘটছে নৃশংস ঘটনা।নানা অজুহাতে কারনে অকারণে বুঝে না বুঝে জেনে না জেনে গণপিটুনিতে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।কেউ কেউ বলছে, কোনো দেশে দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা চালু থাকলে এমনটি হয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মানুষ আইনের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না।
ফলে দেশে নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় কর্তৃত্ববাদী শাসকের পতনের আগে এবং পরে।এনিয়ে ইতিহাস বলছে,
ফরাসি বিপ্লবের পর সে দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।বিক্ষুব্ধ মানুষ অত্যাচারী শাসকের দম্ভের প্রতীক বাস্তিল দুর্গে আগুন ধরিয়ে দেয়।এরপর বিপ্লবীরা বিচারের নামে হাজার হাজার মানুষকে গিলোটিনের মাধ্যমে হত্যা করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী সরকারের শাসনামলে যেমন নৈরাজ্যকর অবস্থা ছিল, তেমনি পতনের পরও বহুদিন এ ধারা অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আলোচনায় আসি;তাহলে আমরা দেখবো, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়সহ যত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোই নৈতিক স্খলন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণে হচ্ছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবার-সমাজ।হিংসা অহংকার অনিষ্টকর মনোভাব তথা মানুষ প্রতিহিংসাপরায় হয়ে উঠছে।
আহত হচ্ছেন উন্নত মূল্যবোধে বেড়েওঠা কিছু মানুষ,ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে আম জনতা।
অপরদিকে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন,স্বজন কেন্দ্রিক ক্ষমতায়ন, দলান্ধ সুবিধা দান, বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি টান ইত্যাকার সমস্যা মিলিয়ে আমাদের পরিবার ও সমাজ প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি!
একটা সময় ব্যক্তির যখন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়, তখন অবধারিতভাবে সে সংস্কৃতিক বিকলাঙ্গে ও আধ্যাত্মিক দেউলিয়ায় পরিণত হয়!তার কাছ থেকে বিদায় নেয় লজ্জা,মানবিকতা, আন্তরিকতা সৌহার্দ্যপূর্ন আচরণ, মানুষ মানুষের প্রতি সম্মান ভালবাসা আদব-আখলাকসহ যাবতীয় সুন্দর আচরণ।হয়ে ওঠে স্বার্থপর ।সেই ব্যক্তি তখন নিজের অবস্থানটাকেই মূখ্য মনে করে। তার চারপাশ হয়ে যায় কেবল আমিময়। আত্ম কেন্দ্রিক ও স্বার্থপরতায় মানুষ আমিত্ববাজে ডুবে যায় এবং তখনই সকল দায়বোধ থেকে মুক্ত ভাবে নিজেকে।
সমাজ পরিবার সামাজিক সুনীতিগুলোকে তার কাছে মনে হয় আবেগ -সেকেলে, অবাস্তব,অপ্রয়োজনীয় ও জঞ্জাল! নিজের অপরিণত বিবেক আর বুদ্ধি যা সায় দেয় তাই তার কাছে সিদ্ধ মনে হয়।
নিজস্বতা বলতে তখন তার আর কিছু থাকেনা।সে হয়ে যায় প্রবৃত্তির দাস।তার মনজগতে চল্তে থাকে অস্থিরতার সুনামি!ছোট ছোট অপরাধ করতে করতে একসময় বড় অপরাধের দিকে ধাবিত হয় সে।
স্বার্থপরতা ঘিরে ধরে একেবারেই। পরিবার আত্মীয়-স্বজন ও নিকটজনের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কোন মূল্য থাকে না তার কাছে।কেউ কার ব্যথায় অবশেষে ব্যথিত হয় না,যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে আর ধীরে ধীরে ছিন্ন হয় সব সম্পর্ক অতঃপর চলতে থাকে সামাজিক ও পারিবারিক অশান্তি।
একসময় তা বিরাট পারিবারিক ক্ষতির কারণ হয়। মানসিক রোগীতে ভরে যায় সমাজে,যার প্রভাব পড়তে থাকে সমাজ সভ্যতার উপর।যা কখনো কখনো খুন পর্যন্ত গড়ায়।নাড়িয়ে দেয় দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-সরকারের আদর্শিক ভিত!তীক্ত হলেও সত্য,যার দৃশ্যমান চিত্র বাংলাদেশের সমাজ সভ্যতায় বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পরিবার থেকে সমাজে কে রক্তের সম্পর্ক কেবা আত্মার সম্পর্ক কারো মধ্যে কোনো হেদায়েত জ্ঞান নেই যেনো।বাপ ছেলেকে ছেলে বাপকে ভাই ভাইকে হত্যাসহ মা তার সন্তানকে হত্যা ও ফেলে রেখে পরকীয়াকান্ডে ঘর স্বামী সংসার পরিবার ছিন্ন করে চলে যাচ্ছে। উন্মাদ আর হিংস্র উগ্রতার প্রভাব বৃদ্ধি পেয়ে হত্যা ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে। 
এসব নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় মূলতঃ প্রাথমিকভাবে পরিবার থেকে শুরু হয় আর পূর্ণতা পায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্র“টিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণেই।এবার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
একসময় দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি আর নতজানু প্রশাসন,অর্থলোভী কর্মকর্তা,শীথিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, দলীয় প্রভাব, পারিবারিক শক্তি, এলাকা ভিত্তিক লালন-পালন, কোন প্রভাবশালী নেতার দলে ভীড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে কেউ কেউ আরো আস্কারা পায়। কেউ কেউ হয়ে যায় ত্রাসের অপর নাম।
চলতে থাকে পারিবারিক-সামাজিক অশান্তি।চরম উদ্বেগে থাকে সমাজের সাধারণ মানুষ।এক পর্যায়ে প্রতারক আর বহুজাতিক অপরাধীরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে সমাজে আর সেই অবক্ষয় স্থান-কাল-পাত্রভেদে বরাবরই চলতেই আছে আমাদের সমাজে। 
ব্যক্তির অবস্থান আর ক্ষমতার প্রেক্ষিতে সমাজের সবচেয়ে ছোট প্রতিষ্ঠান তথা পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানেও সংক্রমিত হচ্ছে দিন দিন।মানুষ হিসেবে কমে যাচ্ছে আমাদের আবেগ অনূভূতি।নামাজী বৃদ্ধি পেলেও কমে যাচ্ছে ধর্মাচারের আগ্রহ ও ধর্মীয় শিক্ষানীতি অনুরসন অনুসরণ।ধর্মে যেটাই নিষেধ করা হয়েছে সেটাই বেশী বেশী দেখা যাচ্ছে সমাজে তবুও নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর আমরা ধর্ম অবমাননা হয় এমন প্রচলিত গল্প বুঝে সমাজে চলছি।
এছাড়া বেড়ে আত্মকেন্দিক মনোভাব সংকীর্ণ মানসিকতায় স্বার্থপরতা হিংসা অহংকার, বেড়ে যাচ্ছে চাহিদা, শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা,বিলাসি জীবনের ইচ্ছা,অনুকরণের ভয়াবহ স্রোত, বেয়াদবির মাত্রাসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত উপসর্গ।নানাসব অসঙ্গতি অপরাধ বাদ যাচ্ছে না পরিবার সমাজ এমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও।
অবক্ষয়টা দেশ সমাজ তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব ফেল্তে বাদ পড়ছেনা।সেখানেও আছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়। 
ফলে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা নেওয়ার পরও একজন মানুষ সত্যিকারের মানুষ হতে পার্ছেনা,শিক্ষিত কোন রাজনৈতিক নেতাও আসছেন না;যিনি সুস্থ নীতি আদর্শে বদলে দেবেন আমাদের সমাজের খোলনলচে।
অন্যদিকে সমাজের শিক্ষিত শ্রেণি ও সৎ মানুষেরা ক্রমেই রাজনীতি বিমুখ হচ্ছেন।
সেই জায়গা দখল নিচ্ছে একদল গোয়ার, মুর্খ _অশিক্ষিত, টোকাই তেলবাজ - অরাজনৈতিক লোভী ও সুযোগ সন্ধানী মানুষ নামের অমানুষ।যারফলে আমরা পাচ্ছি একটি অনিশ্চিত আগামীর স্বদেশ।
পাচ্ছি আগত প্রজন্মের জন্য এক আকাশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তৈরি হচ্ছে একদল সরকারি আমলা আর চাকুরে। তৈরি হচ্ছে কেরানি আর শোষক।রাষ্ট্রের পরতে পরতে,ধাপে ধাপে চলছে ঘুষ দুর্নীতির বাণিজ্য।
চলছে সুদের উৎসব।আর এইসব অমানবিক ও মনুষত্ব্যহীন এবং নৈতিকতা বিবর্জিত ঘুষ আর সূদের কারবারিদের মধ্যে কলমধারী শিক্ষিত ও সমাজের উপর তলার মানুষই বেশি।যারা সমাজটাকে আলোকিত করবেন তারাই এখন স্বার্থপরতায় সুখবিলাসী জীবনের লোভে অন্ধকারের সারথি।কে দেবে আলোকের সন্ধান? কোথায় পাবো আশার সঞ্জিবনী শক্তি।
চারপাশের বাতাস-পরিবেশ এখন বিষাক্ত! মানুষের কেন্দ্রীয় কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে মনে হয়!সমাজের প্রতিটি সেক্টরে আজ সুদখোর আর ঘূষখোরে প্রতাপ।মসজিদ-মাদ্রাসার কমিটিতেও একটা না একটা ঘুষখোর আছেই।নৈতিকতার কোন বালাই নেই যেনো;সরকারি চাকুরেদের মধ্যে।ইয়া লম্বা দাঁড়ি,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছেন নিয়মিত।কিন্তু সেই নামাজ ও সুন্নাত তাকে বাঁচাতে পারছে না ঘুষ দুর্নীতি অপরাধ থেকে।যা দুঃখজনক।কারণটা কী?কোথায় এই সমস্যার উৎস?এরএকটাই কারণ,ভেঙ্গেগেছে আমাদের মূল্যবোধের দেয়াল।ছিড়ে গেছে নৈতিকতার চাদর। দিন দিন মানুষের হতাশা বাড়ছে।বাড়ছে অপরাধের খতিয়ান।দুর্বল ঈমান আর ঈমানী আদর্শহীন মানুষ অন্যায় করেই যাচ্ছে। একদল তা সয়েও যাচ্ছে।
অপরদিকে যারা আদর্শিক মানে উন্নত তারাও অনেকটাই বেখবর থাকছে।তাদের মাঝেও আছে নানা মত-পথ আর অনৈক্যের সাতকাহন।ফলে এক্টা দেশ জাতীয়ভাবে ঘুস দূর্নীতি আর অপরাধের কাছে হেরে যাচ্ছে।বেড়েই চলেছে অপরাধ আর সামাজিক অসঙ্গতি।
হেরে যাচ্ছে ইসলামী আদর্শের নিঃস্বার্থবাদী সৎ ও ভালো মানুষও।ধুকে ধুকে বেঁচে থাকছে মানবতা ও মানুষ, বৃদ্ধি পাচ্ছে যন্ত্ররা।
নিঃশ্বাসে আসছে বিষাক্ত বাতাস. চতুর্দিকে কিচকিচ করছে যেনো হাজারো শুয়োর।সমাজ থেকে যেনো শান্তির ধর্ম ইসলামের নীতি আদর্শ বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে।
কিন্ত কথা ছিলো চূড়ান্ত ধ্বংসের আগেই আমাদের জাগতে হবে।সমাজের প্রতিটি পরতে পরতে পৌঁছে দিতে হবে ইসলামের মহান আদর্শের নৈতিক চেতনা।সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে হবে ইসলামী মূল্যবোধের মশাল।অন্যথায় অবক্ষয় বাড়তেই থাকবে,ভাঙ্গতেই থাকবে সামাজিক নিরাপত্তা আর পারিবারিক শান্তির ঠিকানা।মানুষ একসময় চলে যাবে আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক শুন্যতার চূড়ান্ত সীমানায়। দেশ ও জাতির সৎ মানুষের জন্য রাষ্ট্র হয়ে যাবে আগুনের কারাগার।স্বেচ্ছা নির্বাসন ছাড়া কোন বিকল্প থাকবে না আদর্শিক জীবন চর্চায় অভ্যস্ত মানুষদের!
আদর্শ, মূল্যবোধ আর নৈতিকতার অবক্ষয় রোধে কার্যকর যেসব ব্যবস্থা ইসলাম দিয়েছে আজ তার কোনটাই আর আমাদের সমাজে অবশিষ্ট নেই। 
হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে, “যার মুখ ও হাত থেকে তার প্রতিবেশি নিরাপদ নয় সে মুমিনই নয়।”  কিন্তু আজকের সমাজের দিকে তাকিয়ে কী মনে হয়?আমরা কি কেউ কারো হাত ও মুখ থেকে নিরাপদ আছি? সামাজিক, রাজনৈতিক কোনভাবেই আমরা একজন অন্যজনের হাত ও মুখ থেকে নিরাপদ নই।
রাসূল (সা.) বলেন,“একজন মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকি আর হত্যা করা কুফরি।” কিন্তু আমরা কী দেখছি আমাদের সামাজে।
মানুষকে মেরে ফেলা বর্তমান সমাজে কোন ব্যাপারই মনে হচ্ছে না।আর গালিতো চলছে দেদারছে। মতের মিল হয়নি শুরু গালি। চিন্তার মিল হয়নি দাও গালি। অবৈধ সুবিধা পাই নি শুরু হলো গালি।আজকের সমাজে একে অপরের মধ্যে কোনো কিছুর মিল না থাকলেই হিংসা আর শত্রুতার ছড়াছড়িতে ক্ষতিকর মনোভাব পোষণের গালি এখন প্রায় শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে।এখন তো আবার গালি নাটক সিনেমায়ও চর্চা হয়।বাঙালি সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতার সর্ব মহল সর্বসেক্টরে যেনো গালির চর্চা চলছে,সেযেনো এক এলাহি কান্ড।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের মতে, “সামাজিক বিশৃঙ্খলার অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির ওপর সামাজিক রীতিনীতির প্রভাব হ্রাস পাওয়া।”আর তখন একটি বিশৃঙ্খল সমাজে নিরাপত্তার বালাই থাকেনা।সমাজ যখন নিরাপত্তা—হীন হয়ে যায় তখন একটি পরিবার অবধারিতভাবেই অনিরাপদ হয়ে যায়। শুরু হয় চারপাশে অস্থিরতা। বাড়তে থাকে সামাজিক ও পারিবারিক অপরাধের পরিধি। ফলে সমাজে চলতে থাকে নানাবিধ সমস্যা আর অপরাধের রাজত্ব।
তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, আমরা এখন একটি অস্থির সময় পার করছি। দেশে প্রায়ই ঘটছে নৃশংস ঘটনা।নানা অজুহাতে কারনে অকারণে বুঝে না বুঝে জেনে না জেনে গণপিটুনিতে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।মানুষ হয়ে উঠেছে প্রতিহিংসাপরায়। 
বিশ্লেষকদের মতে,কোনো দেশে দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা চালু থাকলে এমনটিই হয়ে থাকে।বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়ায় মানুষ আইনের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না।ফলে দেশে নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় কর্তৃত্ববাদী শাসকের পতনের আগে এবং পরে।
যা ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব আর দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী সরকারের শাসনামলে নৈরাজ্যকর অবস্থায় সরকার পতনের পরও বহুদিন এধারা অব্যাহত ছিল।যা বাংলার ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তাদের মতে বিগতসরকার আমলে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।পুলিশকে দলীয় অস্ত্রধারীর মতো ব্যবহার করা হত।একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ বাহিনীও আত্মগোপন করে।
কয়েকদিন পর পুলিশ ফিরে এলেও এখনো মনোবল ফিরে পায়নি।ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।স্বাধীন ভাবে একের পর এক ঘটে চলেছে পৈশাচিক ঘটনা।কেউ কেউ বলছে, মব সৃষ্টি করে মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে,চুরির অপরাধে অভিযুক্ত মোয়াজ্জিম নামের যুকবকে ভাত খাওয়াইয়ে শিক্ষার্থীদের পিটুনিতে হত্যা করা থেকে শুরু করে নানাভাবে মানুষকে গণপিটুনিতে মারার ঘটনা উঠে আসছে।
ধীরে ধীরে ছিনতাই চাঁদাবাজি হত্যা ধর্ষণ বৃদ্ধি পেতে পেতে সম্প্রতি রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙাড়ি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। 
গনমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল ভিডিও চিত্রে বলছে,হত্যার আগে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে এবং ইট-পাথরের টুকরা দিয়ে আঘাত করে মাথা- শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়।একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়।তার শরীরের ওপর উঠে লাফায় কেউ কেউ।
ওই ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ,মামলার এজাহার, নিহত লাল চাঁদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও তদন্ত-
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বর্ণনায় হত্যাকাণ্ডের এমন বিবরণ গনমাধ্যমে উঠে এসেছে।
গেল বুধবার মিটফোর্ড(স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) হাসপাতালের সাম্নে ব্যস্তসড়কে প্রকাশ্যে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
গনমাধ্যম আরো উঠে এসেছে, এ ঘটনায় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার কথা। খবরে প্রকাশ,হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলকারণ চাঁদাবাজি।নিহতলাল চাঁদ একসময় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।এঘটনায় পুলিশ ও র‍্যাব চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এঘটনায় পরবর্তী পুলিশী তদন্তে গনমাধ্যমে উঠে এসেছে, ব্যবসায়ীক লেনদেনের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। 
এদিকে গনমাধ্যমে উঠে আসে চাঁদপুর শহরের প্রফেসর পাড়া মসজিদের খতিব, আলেমে দ্বিন আ ন ম নুরুর রহমান মাদানিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছে এক মুসল্লি।
গেল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে হাম্লার ঘটনা ঘটে,স্থানীয় মুসল্লিরা ইমাম সাহেবকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।এসময়ে হামলাকারীকে মুসল্লিরা উত্তম-
মধ্যম দিয়ে মসজিদের বারান্দায় আটকে রাখেন।পরে খবর পেয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশ হামলাকারীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।আরো কত অমানবিক ঘটনা নিয়ে চলছে বর্তমান সমাজ। 
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এধরনের নৃশংসতা এবারই প্রথম নয়।কিংবা এটা যে নতুন করে বেড়ে গেছে, তা-ও নয়। একটা সময়ে জমি দখল বা চর দখলের জন্য প্রকাশ্যে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর এমন নৃশংসতা চালাত।সেসব এখন হয়ত নেই।তবে ধরন পাল্টেছে। সমাজ ব্যবস্থাও একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।রাজনৈতিক কারণে সমাজে অস্থিরতা বেড়েছে। সেইসঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে।সমাজে নানারকম নেতিবাচক অনুষঙ্গ ঢুকে পড়েছে।একারণে নৃশংস অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে।আমরা মনেকরি,পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এধরনের নৃশংসতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন
,কেননা কোনো সভ্য সমাজে এটা কাম্য নয়।
একটি সমাজ যখন তার নৈতিক অবস্থান হারায় তখন সেই সমাজে ধেয়ে আসে এমননানা অপরাধের সুযোগ,সমাজের আবাল-বুদ্ধ-বণিতা হয়ে যায় অপরাধ প্রবণ। আইন তখন আর সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সবাই খুঁজতে থাকে আইনের ফাঁকফোকর।সেইসব ফাঁকফোকর গলে অপরাধিরা সহজেই মুক্তি পায়। মুক্তির পর শুরু করে আরো বেশি অপরাধকান্ড।
ফলে সমাজে বাড়তে থাকে ইভটিজিং, মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি,দুর্নীতি,কিশোর অপরাধ,ছিনতাই ধর্ষণ,হত্যা, গুম
,মিথ্যা মামলা,নারী নির্যাতন,পরকীয়া,যৌতুকের ভয়াবহতা
, অপহরণ,হাইজ্যাক, কিডন্যাপ,উৎকোচ ইত্যাদি অপরাধ।বাড়তে থাকে রাজনৈতিক সহিংসতা।মানুষের জীবনে নেমে আসে স্তবিরতা।জনজীবনে আসে আতঙ্ক উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চিত আগমীর পদধ্বনি।
ভাঙ্গন ধরে পারিবারিক,সামাজিক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে। তৈরি হয় বিভেদের দেয়াল ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশির। বন্ধুর সাথে বন্ধুর।নৈতিক আর আদর্শিক ঐশ্বর্য না থাকলে চিন্তাগত ও আদর্শগত মতানৈক্যের কারণে শত্রুতার বীজ বুনে যায় যে কেউ।
বর্তমানে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দলনীতিতে তাই দেখছি।পরমত সহিষ্ণুতা চলে যায় শূন্যে। সমালোচনাও হয়ে যায় শত্রুতা।প্রতিবাদ হয়েযায় যুদ্ধ,ক্ষমতার জন্য মানুষ হয়ে যায় অন্ধ একঘেয়েমি ও আত্ম কেন্দ্রিক স্বার্থপর ।
একপর্যায়ে সবাই ভুলে যায়,পরিবার ও সমাজকে বাঁচিয়েই রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হবে। আর রাষ্ট্রকে বেঁচে থাকতে হলে তাকে তৈরি করতে হবে সুনাগরিক।সুনাগরিকের অন্যতম শর্ত হল তারা হবে নৈতিক মানে উন্নত। সামজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জিবীত।আদর্শিক চেতনায় সুদৃঢ়। কর্ম প্রচেষ্টায় নিয়মিত।
এখন যদি আমরা পরিবার,সমাজ- রাষ্ট্রকে নিয়ে সফল হতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের নৈতিক মানে উন্নত হতে হবে, উন্নত হতে হবে মানসিকতার দিক থেকেও।আর এই মান উন্নয়নে পরিবার সমাজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সবাই এক একযোগে কাজ করতে হবে।
সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর কর্তে নিতে হবে ব্যাক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
প্রতিটি মানুষকেই যার যার যায়গা থেকে সচেতন হয়ে চেষ্টা চালাতে হবে সম্মিলিত ভাবে।
এককপ্রচেষ্টায় কখনো এঘুনেধরা সমাজ ও দেশের নৈতিক আদর্শিক,আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্বের শেষ করা যাবে না।সেক্ষেত্রে___
শিক্ষক সুশীলসমাজ,রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মসজিদের ইমাম ও সচেতন জ্ঞানী সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সৎ ও ভাল মানুষকে সাহসি নির্ভিক চেতনা নিয়ে।
সর্বোপরি দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থা উন্নতি এবং সমাজ দেশের সুস্থতায় মানুষের যানমাল নিরাপত্তায় সহযোগিতা মনোভাব নিয়ে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।তাহলেই আমরা পাবো একটি সুস্থ নিারাপদ পারিবারিক, সামাজিক তথা সুস্থ সমাজ সভ্যতা এবং সুস্থ বাংলাদেশ।