ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী বিমানে বোমা থাকার ভুয়া খবর ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনায় নেপথ্যে উঠে এসেছে রীতিমতো সিনেমাকেও হার মানানো এক পারিবারিক নাটকীয়তা। ছেলের পরকীয়া সম্পর্ক ঠেকাতে পরিকল্পিতভাবে এই ভয়ঙ্কর ছক কষে তারই মা ও স্ত্রী!ঘটনার পর র্যাবের তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য, যা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
গতকাল (১১ জুলাই) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট যখন ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC)-এ আসে একটি বোমা হুমকির ফোন।
ফলে সঙ্গে সঙ্গে স্থগিত করা হয় ফ্লাইট, গড়ে তোলা হয় উচ্চ নিরাপত্তাবলয়। উড়োজাহাজে থাকা ১৪২ যাত্রী ও ৭ জন ক্রু সদস্যকে নামিয়ে চলে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার তল্লাশি-যা রাত ৭টা ৫৮ মিনিটে শেষ হয়। তবে কোনো বোমা বা বিস্ফোরক সামগ্রী মেলেনি।
আজ শনিবার সকালে কারওয়ান বাজারে র্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে, র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান জানান, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে জানা যায়, ঘটনাটি একটি পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হয়েছে।
র্যাব জানায়, ইমন নামে এক ব্যক্তি তার পরকীয়া প্রেমিকাকে নিয়ে কাঠমান্ডু যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিষয়টি জানতে পারেন ইমনের মা ও স্ত্রী। তারা প্রথমে নানাভাবে ইমনকে যাত্রা থেকে বিরত রাখতে চাইলেও ব্যর্থ হন।
এ অবস্থায় ইমনের এক বন্ধু ইমরান পরামর্শ দেন-"বিমানবন্দরে বোমা থাকার ভুয়া তথ্য দিলে ফ্লাইট স্থগিত হবে।" সেই মোতাবেক ইমনের মা নিজেই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে ফোন করে বোমা থাকার তথ্য দেন।
ভুয়া হুমকির কল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরে মোতায়েন করা হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, র্যাব, এভসেক, এপিবিএন ও ডগ স্কোয়াড-সহ একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা।
বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল উড়োজাহাজের অভ্যন্তর ও যাত্রীদের লাগেজ একে একে স্ক্যান করে। তবে শেষ পর্যন্ত সব কিছু নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব মহাপরিচালক বলেন: “এটি কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি ভয়ংকর অপরাধ। এ ধরনের মিথ্যা তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ও জাতীয় এয়ারলাইন্সের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধ করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার তিনজন হলেন:
ইমনের মা
ইমনের স্ত্রী
ইমন ও তার পরিবারের পরিচিত বন্ধু ইমরান — যিনি এই পরিকল্পনার মূল পরামর্শদাতা।
তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বিমান নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
র্যাব ডিজি জানান, এর আগেও বাংলাদেশে এ ধরনের ভুয়া বোমা হুমকির ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের ঘটনা ভিন্ন, কারণ এটি একটি পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্টি হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে একটি নতুন মাত্রার চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতে যাতে কেউ ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকি না নেয়, সেই বিষয়ে সচেতনতা ও শাস্তির দৃষ্টান্ত গড়ার পক্ষে কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
এ ঘটনায় র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা প্রশংসিত হলেও প্রশ্ন উঠেছে-কিভাবে একটি ফোন কলেই এত বড় বিমান তল্লাশি চালানো হয়, তাতে ফ্লাইট সুরক্ষা ব্যবস্থায় কি কোনো দুর্বলতা রয়ে গেছে?
কিওয়ার্ডস: ঢাকা কাঠমান্ডু ফ্লাইট বোমা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ভুয়া হুমকি, পরকীয়া ঠেকাতে মা স্ত্রীর পরিকল্পনা, র্যাব সংবাদ সম্মেলন বোমা কল, বিমানে বোমা নেই, বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশি, বাংলাদেশ বিমান নিরাপত্তা ঘটনা