ইউরোপে তীব্র দাবদাহে এক সপ্তাহেই ২৩০০ মৃত্যু: বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জলবায়ু সংকেত স্পষ্ট

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৭-১০ ০০:৪৭:৫০
image

ইউরোপের ১২টি দেশে সম্প্রতি শেষ হওয়া তীব্র দাবদাহে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৩০০ মানুষ। বুধবার (৩ জুলাই) প্রকাশিত এক জরুরি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবদাহ এখন আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে, এবং তার পরিণতি সরাসরি মানুষের জীবনহানিতে পরিণত হচ্ছে।
২ জুলাই পর্যন্ত চলা ওই ১০ দিনের দাবদাহে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপের বিশাল অংশ অতিমাত্রার গরমে পুড়েছে।
বিশেষ করে স্পেনের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণাটি পরিচালনা করে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন। এতে বলা হয়, “প্রায় ২৩০০ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তীব্র গরমের সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৫০০ মৃত্যু সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহের কারণে।”
গবেষক ড. বেন ক্লার্ক বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গরম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা মানবদেহের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।”
গবেষণায় বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, লন্ডন, মিলানসহ ইউরোপের ১২টি বড় শহর অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিজ্ঞানীরা অতীতের স্বাস্থ্যগত তথ্য, আবহাওয়ার হিসাব এবং মহামারি সংক্রান্ত মডেল ব্যবহার করে নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করেন।
তারা জানান, “আমরা এমন মৃত্যুর হিসাব নিয়েছি, যেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রধান কারণ, অথবা যেখানে অতিরিক্ত গরম পূর্বনির্ধারিত স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।”
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, “এগুলো আনুমানিক হিসাব। অধিকাংশ দাবদাহ-সম্পর্কিত মৃত্যু সরকারি রেকর্ডে আসে না। আবার অনেক দেশ এই তথ্য প্রকাশেও অনাগ্রহী।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস বুধবার জানিয়েছে, “২০২৫ সালের জুন ছিল ২০২৪ ও ২০২৩ সালের পর রেকর্ডকৃত তৃতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ জুন।”
পশ্চিম ইউরোপে এই জুন মাসটি ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাসম্পন্ন মাস। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
কোপারনিকাসের স্ট্র্যাটেজিক লিড সামান্থা বুরগেস বলেন, “পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। যার ফলে দাবদাহ এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে -যা ইউরোপজুড়ে মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।”
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইউরোপের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো আশঙ্কা করেছিল- “২০২২ সালে দাবদাহে ইউরোপজুড়ে কমপক্ষে ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।”
এ বছরের গবেষণা বলছে, দেশগুলোর জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি এখনও মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দাবদাহের মতো চরম আবহাওয়া মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা জোরদার করা এখন জরুরি।
বিজ্ঞানীরা বলেন, “বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বাড়ছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো। এর ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যখন দাবদাহ আসে, সেটি আগের তুলনায় আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে।”
ইউরোপের চলমান দাবদাহ ও মৃত্যু সংখ্যা কেবল একটি সংকেত নয়-এটি একটি জরুরি বার্তা। বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে, আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যাই কেবল বাড়বে।

কিওয়ার্ডস:

ইউরোপ দাবদাহ ২০২৫, ইউরোপে দাবদাহে মৃত্যু, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, স্পেন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি, কোপারনিকাস ক্লাইমেট রিপোর্ট, ইম্পেরিয়াল কলেজ গবেষণা, ইউরোপ দাবদাহ প্রস্তুতি, পশ্চিম ইউরোপ তাপপ্রবাহ, জলবায়ু সংকট ইউরোপ