আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। একদিকে রক্তাক্ত ইতিহাস, অন্যদিকে মুক্তির আদর্শ। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শোকাবহ, অথচ বিপ্লবী এ দিনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মীয় ভাবগম্ভীরতায় পালিত হচ্ছে।
পবিত্র আশুরা মূলত কারবালার রক্তাক্ত প্রান্তরে নবী বংশের মহান ত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধের দিন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এই দিনে ইরাকের কারবালায় ইয়াজিদের সেনাদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারবর্গ। সেই থেকে আশুরা শুধু ইতিহাস নয়, হয়ে উঠেছে সত্য, ন্যায় ও প্রতিবাদের প্রতীক।
বাংলাদেশে শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ আশুরাকে পালন করেন নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। রাজধানী ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী হোসেনি দালান ইমামবাড়ায় ভোর থেকেই শুরু হয় ধর্মীয় আলোচনা, দোয়া ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি। দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, বিশেষ করে রাজধানীর পুরান ঢাকায় আশুরা উপলক্ষে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কারবালার আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়ে দেয়-ক্ষমতার সাথে নয়, ন্যায়ের সাথে দাঁড়াতে হয়। আশুরা কেবল আবেগ-ভক্তির বিষয় নয়; এটি একটি চেতনা, যা অন্যায়, স্বৈরাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অনন্য দৃষ্টান্ত।
আজকের বাংলাদেশেও এই চেতনার প্রয়োজন প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে-যেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য, দমন-পীড়ন কিংবা সামাজিক অবিচার নানা রূপে বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে আশুরা আমাদের প্রশ্ন করে-আমরা কী ইমাম হুসাইনের মত সত্যের পাশে দাঁড়াতে পারি?
ইতিহাসবিদরা বলেন, আশুরা কোনো নিরব কান্না নয়, এটি একটি উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ। যেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করতে হয়।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আশুরাকে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেন, তারা মূল বার্তাটিকে হারিয়ে ফেলেন। আশুরা শুধু তাজিয়া বা মাতমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়-এটি জাগরণের দিন।
হাদিসে এসেছে, এই দিনেই নুহ (আ.)-এর কিস্তি জুদি পাহাড়ে থেমে যায়। মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দেন আল্লাহ। এদিন রোজা রাখা সুন্নত, যা দুই দিন-৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম পালন করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের মসজিদে মসজিদে আজ বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে—দেশের শান্তি, শোকাহত মানুষের সান্ত্বনা, এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায়। কারবালার শহিদদের স্মরণ করে বিভিন্ন এলাকায় আয়োজন করা হয়েছে তাবারুক বিতরণ, কোরআন খতম ও মিলাদ মাহফিল।
পুরান ঢাকার হোসেনি দালান থেকে সকাল ১০টার দিকে শুরু হয়েছে তাজিয়া মিছিল। নানা প্রতীকি ব্যানার, কালো পোশাকে সজ্জিত মানুষ এবং “হায় হুসাইন” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মিছিলপথ। নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
আশুরা আমাদের শুধুই শোকের অতীতে ফিরিয়ে নেয় না; এটি সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা দেয়। আজকের বাংলাদেশেও যখন আমরা নানাবিধ অন্যায়-অবিচারের মুখোমুখি, তখন কারবালার বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-চুপ থাকা নয়, প্রতিবাদ করাই ঈমানদারির প্রমাণ।
আশুরা ২০২৫, পবিত্র আশুরা, কারবালার শিক্ষা, ইমাম হুসাইন, হোসেনি দালান, তাজিয়া মিছিল, বাংলাদেশে আশুরা, মহররম, শোক ও প্রতিবাদ, আশুরার তাৎপর্য, সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক