ঢাকা: ২ জুলাই ২০২৫,
বাংলা সংগীতের সোনালি অধ্যায়ের এক নীরব প্রদীপ আজ নিভে গেল। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানা আর নেই। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭০ বছরের বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন জীনাত রেহানা। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার পরিবার। সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে নিরব বিষাদের ছায়া।
তিনি ছিলেন শুধু কণ্ঠশিল্পী নন, ছিলেন বাংলা আধুনিক ও আধ্যাত্মিক সংগীতের এক স্থায়ী ছায়া।
তার স্বামী প্রয়াত মোস্তফা কামাল সৈয়দ দেশের একজন খ্যাতিমান টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
জোহরের নামাজের পর ঢাকার গুলশানের আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজা। এরপর বিকেল ৩টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। গানের মানুষটির বিদায়ে শ্রদ্ধায় নত হয় শিল্পী-সংস্কৃতিমনা মানুষদের মাথা।
জীনাত রেহানার সংগীতযাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে, বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে। মাত্র চার বছর পর ‘সাগরের তীর থেকে’ গানটি তাকে এনে দেয় তুমুল জনপ্রিয়তা।
১৯৬৫ সালেই তিনি যুক্ত হন টেলিভিশনের পর্দায়। পরে পেশাগত কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকায় সংগীতে তার উপস্থিতি সীমিত থাকলেও, তার গাওয়া অল্পসংখ্যক গানই হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী স্মারক।
তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে-
"একটি ফুল আর একটি পাখি বলতো কি নামে তোমায় ডাকি"
"আমি কাকন দিয়ে ডেকেছিলেম মুখে লজ্জা ছিল বলে"
"কপালে তো টিকলি পরবো না"
"আমার যার কথা ভাবছি মনে আনমনে"
"আমায় যদি ডাকো কাছে"
"কণ্ঠবীণা"
"মনে রেখো, স্মৃতি থেকে"
এই গানগুলো যেন একটি যুগের প্রতিনিধি, এক অপূর্ব সংগীত ঐতিহ্যের অংশ, যা আজও শ্রোতাদের কণ্ঠে বাজে।
শিশুতোষ গান থেকে আধ্যাত্মিক সংগীত-সব শাখাতেই রেখেছেন নিজের স্বাক্ষর। আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে তার অবদান নিঃসন্দেহে সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। তার কণ্ঠে গান কম হলেও, প্রতিটি গান হয়ে উঠেছে অমূল্য সংগীত সম্পদ।
সংগীত বিশ্লেষক সৈয়দ শওকত হোসেন বলেন- “জীনাত রেহানা ছিলেন এক ‘সোনালি কণ্ঠের অধিকারিণী’। যে গভীরতা, আবেগ ও সৌন্দর্য তিনি প্রতিটি গানে ঢেলে দিতেন, তা আজ আর পাওয়া যায় না।”
তার কণ্ঠে শোনা যেত একধরনের মায়াবী নরমতা, যা শ্রোতার মনে দীর্ঘস্থায়ী আবেশ তৈরি করত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে মনে রাখবে, কেবল একটি গানের জন্য নয়-বাংলা সংগীতের এক নিঃশব্দ বাতিঘর হিসেবে।
জীনাত রেহানার প্রয়াণে বাংলা সংগীত শুধু একজন শিল্পীকে হারায়নি-হারিয়েছে এক অধ্যায়, এক অনুভব, এক ঐতিহ্য।
তার গান রয়ে যাবে, বাজবে-আমাদের কান থেকে হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।