চলতি বছরের ২৪ জুন থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ-এ শুরু হয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনকে ঘিরে যখন ইউরোপজুড়ে কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনার ঢেউ, ঠিক তখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে উঠে আসছে চরমপন্থী কিছু বক্তব্য ও আশঙ্কার ছায়া।
এরইমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নবনিযুক্ত প্রধান কূটনীতিক কাজা কালাস এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। স্ট্রসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “ন্যাটো ও ইইউ যদি একজোট হয়, তবে রাশিয়ার আর কিছুই করার থাকবে না। আমাদের একজোট হতে হবে আগ্রাসী পুতিনকে থামাতে।”
তবে এই আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য ঘিরেই চরম মতানৈক্য তৈরি হয়েছে বিশ্লেষক মহলে। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ২৩টিই ন্যাটোভুক্ত। আবার এদের মধ্যে জার্মানি ও ফ্রান্স, উভয়ই ইইউ-এর চালিকাশক্তি এবং একইসাথে ন্যাটোর মূল ভিত্তি। এ অবস্থায় কালাসের বক্তব্য রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর দ্বন্দ্বকে আরও ঘনীভূত করবে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
এরইমধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গ ইকোনমিক ফোরামে তিনি বলেন, “যেখানে রুশ বাহিনীর পা পড়ে, সেটাই আমাদের। ইউক্রেনের সীমানা আর রাশিয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”
তবে এখানে আরও একটি জটিলতা আছে। ন্যাটোর সামরিক সক্ষমতার মূল চালিকা শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই রাশিয়াবান্ধব অবস্থানে রয়েছেন। কানাডায় সাম্প্রতিক জি-৭ বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “রাশিয়াকে আবারও জি-৭-এ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।” পাশাপাশি তিনি প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর কম ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং জিডিপির অন্তত ৫% প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, যেখানে চীনের প্রভাব বাড়ছে দিন দিন। ফলে ইউরোপ থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি স্থানান্তরের পরিকল্পনা এখন ওপেন সিক্রেট।
ন্যাটোর সম্মিলিত বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখ হলেও এর মধ্যে ২০ লাখই যুক্তরাষ্ট্রের। বিপরীতে রাশিয়ার সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র লড়াইয়ে না এলে সংখ্যার বিচারে প্রায় সমান সমান হয়ে দাঁড়াবে যুদ্ধের ভারসাম্য। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় সেনারা দীর্ঘদিন সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় তাদের বাস্তব যুদ্ধ অভিজ্ঞতা অনেকটাই কম।
ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেই রয়েছে মতভেদ। যেমন তুরস্ক, যার ৮ লাখের বেশি সক্রিয় সৈন্য রয়েছে, বেশ কিছু বছর আগেই রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে, যা নিয়ে ন্যাটোর ভেতরে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একইভাবে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে। গ্রিস ও তুরস্কের পুরনো সীমান্তবিরোধও জোটের ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ইতালির পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। অভ্যন্তরীণ সংকট, প্রবীণ জনসংখ্যার চাপ এবং বাজেট ঘাটতির কারণে জর্জিয়া মেলোনির সরকার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে অনিচ্ছুক। ফলে ন্যাটোর ঐক্য এখন ‘মিথ’ বলেই মনে করছেন অনেকেই।
রাশিয়া বর্তমানে শুধু সৈন্য বা অস্ত্রে নয়, পরমাণু শক্তি, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, মহাকাশে সামরিক কার্যক্রম এবং সাইবার সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। সিপ্রির তথ্য মতে, রাশিয়ার কাছে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের চেয়েও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহতা ইতিমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, যার জবাবে ন্যাটোর সদস্যদের হাতে কার্যকর কিছু নেই।
রাশিয়ার অতীত ইতিহাসও বলে, চাপের মুখে তারা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ১৮১২ সালের বিজয় কিংবা নাৎসি বাহিনীকে স্টালিনগ্রাদে পরাজিত করার মতো ঘটনা রাশিয়ার জাতীয় অহংকারের অংশ।
বর্তমানে ইউক্রেনের ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। লুহানস্ক, ডোনেৎস্ক, জাপোরিজঝিয়া, খেরসন, খারকিভ, ডিনিপ্রো সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে মস্কোর নিয়ন্ত্রণ। ২০১৪ সালেই ক্রিমিয়া দখল করেছিল রাশিয়া।
পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে বোঝা যায়, ইউক্রেনকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে দেখার অবস্থান তিনি ছাড়েননি। ফলে আগামী দিনে পূর্ণ ইউক্রেন দখলের চেষ্টা ন্যূনতম বিস্ময়ের কিছু নয়।
ন্যাটো যদি সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তাহলে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সমর্থন পাবে মস্কো-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। চীন ইতিমধ্যেই ইউরেশিয়ান ব্লকের সামরিক ও বাণিজ্যিক অংশীদার। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া প্রকাশ্যে রাশিয়ার অস্ত্র সরবরাহে সহযোগিতা করছে।
ন্যাটোর দ্য হেগ বৈঠকের ঠিক আগে পুতিনের ইউক্রেন পূর্ণ দখলের ঘোষণা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিক কালাসের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য ইউরোপজুড়ে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। সামরিক ব্যয় বাড়ানো, জোটের ভেতরের মতভেদ এবং মার্কিন দ্বিধার মধ্যে দাঁড়িয়ে একটি বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার অতীত প্রতিরোধের ইতিহাস ও বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনায় অনেকেই বলছেন-ন্যাটো যদি সত্যিই সরাসরি যুদ্ধে নামে, তবে ইউরোপের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যেতে পারে।