জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থার মধ্যেও মাঠ প্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর বার্তা দিয়েছে। দেরিতে অফিসে যোগদান, অনুপস্থিতি কিংবা বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগকে ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে কর্মীদের সতর্ক করেছে এনবিআর কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (২৭ জুন) এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্দোলনের ফলে রাজস্ব বিভাগের মাঠ পর্যায়ের সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে, যা জনগণের স্বাভাবিক সেবা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। এমতাবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিত না থাকলে সরকারি বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বছরের শেষ তিন কার্যদিবসে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে এনবিআর-এর আওতাধীন সব কাস্টমস হাউস, কর কমিশনারেট এবং ভ্যাট কমিশনারেটকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। দপ্তরে অনুপস্থিতি ঠেকাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগের আগে রেজিস্টারে এন্ট্রি এবং দপ্তর প্রধানের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ নির্দেশনার মধ্যেই এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ডাকা শনিবার (২৮ জুন) ‘মার্চ টু এনবিআর’ ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত ১২ মে জারি হওয়া একটি অধ্যাদেশকে ঘিরে। এতে এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বিলুপ্ত করে ‘রাজস্বনীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠন করা হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ শর্ত অনুযায়ী কাঠামোগত সংস্কারের অংশ।
কিন্তু এনবিআর কর্মকর্তারা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে নন, বরং পদায়নে নিজেদের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দাবি করছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য পদ সংরক্ষণের ফলে রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সংকট জিইয়ে রাখার অভিযোগও তুলেছেন তারা।
চলমান অচলাবস্থা নিরসনে বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান, অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবসহ মোট ১৬ জন সদস্য।
বৈঠকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
১. চলমান আন্দোলন প্রত্যাহার,
২. বিতর্কিত দুটি বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা, এবং
৩. আগামী ১ জুলাই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা সভার আয়োজন।
বৈঠকে এটাও জানানো হয়, ‘রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন জুলাইয়ের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার বলেন, “আমরা সংস্কারের পক্ষে, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে। এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ছাড়া চলমান সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “নিপীড়নমূলক বদলির সংস্কৃতি বাতিল করতে হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনবিআরের হঠাৎ এই কঠোর বার্তা আন্দোলনকারীদের ওপর একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রয়াস। কারণ, ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচির একদিন আগে কর্মস্থলে শারীরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা আসা নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বহন করে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি চলমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তবে রাজস্ব সংগ্রহ, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনে জোর দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
২৮ জুন: ‘মার্চ টু এনবিআর’ ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’
১ জুলাই: ত্রিপক্ষীয় আলোচনা সভা
৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সম্ভাব্য অধ্যাদেশ সংশোধন