রাজধানীর সরকারি মিরপুর বাংলা কলেজ কেন্দ্রের বাইরে একটি মেয়ের কান্না যেন আজ গোটা সমাজের বিবেক নাড়া দিল। অসুস্থ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে ছুটে এসেছিল পরীক্ষার হলে-কিন্তু সময়মতো কেন্দ্রে প্রবেশ না করতে পারায় তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার সারাদেশে একযোগে শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এ দিন সকাল থেকেই পরীক্ষার্থীদের আনাগোনায় মুখর ছিল কেন্দ্রগুলো। কিন্তু মিরপুর বাংলা কলেজ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরী পরীক্ষার্থীর বেদনাময় দৃশ্য ছাপিয়ে যায় সবকিছু।
জানা যায়, মেয়েটির বাবা বেঁচে নেই। একমাত্র মায়ের ওপরই নির্ভর তার ছোট্ট পৃথিবী। সেই মা হঠাৎ মেজর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন পরীক্ষার দিন সকালেই। স্বজনহীন এই পরিবারে মেয়েটিই তখন হয়ে ওঠে তত্ত্বাবধায়ক, অ্যাম্বুলেন্স ডাকার থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত সব দায়িত্ব সে একাই সামলায়।
এরপর শুরু হয় সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে প্রাণপণ দৌঁড়, ছুটে চলা-কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। কেন্দ্রের দরজায় পৌঁছতেই শুনতে হয়, “সময় শেষ, প্রবেশ নয়।”
ঘটনাটির ভিডিও ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণী কান্নাভেজা মুখে কেন্দ্রের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে। তার মুখে অনুশোচনা নয়, ছিল শুধুই হাহাকার-মা ও স্বপ্নের মাঝখানে আটকে যাওয়া এক গল্প।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনরাও প্রশ্ন তুলছেন-একটা পরীক্ষা কি মানবিকতার চেয়ে বড়?
ঘটনাটি এখন রাষ্ট্রীয় নজরেও এসেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, বিষয়টি তারা গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার বলেন: “আমরা বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। আইনি কাঠামোর মধ্য থেকেই ওই শিক্ষার্থীর বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। তার এই সংকটে আমরা পাশে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা অনুরোধ করছি, ওই পরীক্ষার্থী যেন উদ্বিগ্ন না হয়। আমাদের দায়িত্ববোধ এখানেই প্রমাণ করতে হবে যে, শিক্ষাব্যবস্থা শুধুই নিয়ম নয়-এটি মূল্যবোধও শেখায়।”
পাবলিক পরীক্ষায় ‘সময়মতো কেন্দ্রে উপস্থিত না হলে পরীক্ষা দিতে না পারা’ নিয়ম দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে কী সত্যিই কোনো মানবিক ব্যত্যয় ঘটানো যায় না?
শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, “শিক্ষা ব্যবস্থায় নমনীয়তা ও মানবিকতা একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত। এই মেয়েটির ঘটনাই প্রমাণ করে, বইয়ের বাইরেও আমাদের অনেক শেখার বাকি।”
এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনেই এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য যেমন চোখে জল এনেছে, তেমনি সমাজ ও প্রশাসনের সামনে ফেলে দিয়েছে বড় এক প্রশ্ন-আমরা কি নিয়মে আটকে মানবিকতাকে গলা টিপে ধরছি না?
আমাদের শিক্ষা শুধু ‘ঘণ্টা’ আর ‘ঘোষণা’ নির্ভর হবে, না কি ‘সমবেদনা’ আর ‘সহমর্মিতা’র আলোয় আলোকিত হবে-সেটিই এখন ভাবনার বিষয়।
আজকের এই পরীক্ষার্থী শুধু একটি খাতা জমা দিতে পারেনি নয়, সে আমাদের বিবেককে প্রশ্ন রেখে গেছে। রাষ্ট্র, শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ-সবাই কি তার উত্তর দিতে প্রস্তুত?