অজানা অথচ ভয়ংকর: ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-২৩ ১৬:০৫:০৫
image

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে ইসরায়েলের বহু আলোচিত কিন্তু কখনো স্বীকৃত নয়—পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি। ‘আমিমুত’ নামে পরিচিত এক কৌশলগত অস্পষ্টতার মধ্য দিয়েই যুগের পর যুগ ধরে ইসরায়েল এই অস্ত্রক্ষমতা ধরে রেখেছে। যদিও তারা কখনো প্রকাশ্যে অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পাল্টাপাল্টি ঘটনায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উত্তেজনা পারমাণবিক মাত্রায় পৌঁছালে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বকেই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ইসরায়েলের পরমাণু কর্মসূচির গোড়াপত্তন হয় ১৯৫০-এর দশকে। ফ্রান্সের সহায়তায় দক্ষিণ ইসরায়েলের ডিমোনা শহরের নিকটে গড়ে তোলা হয় ‘নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার’। সরকারি ভাষায় এটি ‘শান্তিপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র’, তবে বাস্তবে এটি যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল প্রস্তুতকারক প্লুটোনিয়াম চুল্লি-তা বহু আগেই ফাঁস হয়ে যায়।
১৯৬২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি গোপন নথি প্রকাশ পায়, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়, ডিমোনায় গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্প চলছে।
ইসরায়েলের সাবেক পরমাণু প্রকৌশলী মোর্দেচাই ভানুনু ১৯৮৬ সালে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য সানডে টাইমস-এ একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ইসরায়েলের হাতে তখন ১০০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। তিনি যে ছবি ও তথ্য ফাঁস করেন, তা বিশ্বকে নাড়া দেয়। পরিণতিতে তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ ইসরায়েলের হাতে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। তবে পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূল সংখ্যার অনেক নিচে হতে পারে। কারণ ডিমোনার চুল্লির আসল উৎপাদন ক্ষমতা সরকারিভাবে বলা ২৬ মেগাওয়াট নয়, বরং তা ৭০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট হতে পারে-যা বিপুল অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে।
ইসরায়েলের এই দ্ব্যর্থতার কৌশল-স্বীকারও নয়, অস্বীকারও নয়-নিরাপত্তার চেয়ে কৌশলগত শক্তির অংশ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ একে বলেন, "এই অস্পষ্টতাই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।"
তবে সমালোচকদের মতে, এই অস্বচ্ছতা মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে, বিশেষ করে ইরান, সৌদি আরব এবং মিশরের মতো শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-তে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু ইসরায়েল এখনো এই চুক্তিতে অংশ নেয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) ইসরায়েলের কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শনের আইনগত অধিকার রাখে না। এদিকে ইরান সহ অন্য মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলো এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী হলেও ইসরায়েলের চাপ ও হুমকিতে তারা পিছিয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি ইসরায়েলের আগ্রাসন ও পক্ষপাতদুষ্ট আন্তর্জাতিক নীতির অবসান না হয়, তাহলে তারা NPT থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করবে-যা আরো একটি ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণের পূর্বাভাস।
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ ইনস্টিটিউট (UNIDIR) জানিয়েছে, ইসরায়েলের এই গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষক জেভিয়ার বোহিগাস বলেন, “যখন একটি দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের তথ্য অজানা থাকে, তখন গাণিতিক মডেল ও চুল্লির আউটপুট বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য অস্ত্র সংখ্যা অনুমান করা হয়। এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি।”
ইসরায়েলের এই অবস্থানকে বিশ্বে দ্বৈত নীতির জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বহু বিশ্লেষক। যেখানে উত্তর কোরিয়া বা ইরান পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, সেখানে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের পক্ষ থেকে নৈতিক আশ্রয় পায়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- “বিশ্ব কি শুধুই রাজনৈতিক সুবিধাবাদে চলছে? নাকি নিরস্ত্রীকরণ সত্যিই কোনো আদর্শিক লক্ষ্য ছিল?”

মধ্যপ্রাচ্য এখন পারমাণবিক অস্থিরতার দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে। ইসরায়েলের অস্পষ্ট নীতির পরিণতি শুধু আঞ্চলিক শান্তিকে নয়, বিশ্ব নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে। এখনই যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অস্পষ্টতা ঘোচাতে সচেষ্ট না হয়, তাহলে আগামীর দিনগুলো হয়তো আরেকটি পারমাণবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে বাধ্য হবে মানবসভ্যতা।

তথ্যসূত্র: SIPRI, UNIDIR, The Sunday Times, IAEA রিপোর্ট ও বিশ্লেষক মতামত