দামাস্কাসে গির্জায় ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা: অন্তত ২০ নিহত,দায়েশের দায় স্বীকার

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-২৩ ০২:৪৭:৫২
image

সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে অবস্থিত খ্রিস্টানদের পবিত্র উপাসনালয় মার এলিয়াস গির্জায় এক আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত এই হামলায় স্তব্ধ হয়ে গেছে দামাস্কাসের দ্বেইলা এলাকা। ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার স্থানীয় সময় বিকেলে, যখন গির্জার ভেতরে চলছিল প্রার্থনা ও ধর্মীয় সমাবেশ।
হামলার ধরণ ছিল ভয়ানক। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলাকারী ছিলেন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন দায়েশের (আইএস) সক্রিয় সদস্য। প্রথমে তিনি গির্জার ভেতরে প্রবেশ করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করেন। পরে নিজের শরীরে বাঁধা বিস্ফোরকভর্তি ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন।
সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনাস্থলে আরও একজন হামলাকারী উপস্থিত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত তার কোনো অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। এই কারণে রাজধানীজুড়ে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা, বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা নজরদারি।
রাজধানীর সবচেয়ে পুরনো গির্জাগুলোর একটি মার এলিয়াস এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। সিরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধার সংস্থা 'হোয়াইট হেলমেটস' ঘটনার পরপরই একটি সরাসরি সম্প্রচার করে। তাতে দেখা যায়, গির্জার ভেতরে রক্তে ভেজা মেঝে, ভাঙা বেঞ্চ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন জামাকাপড় এবং কান্নায় ভেঙে পড়া মানুষ।
সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরুতে ৯ জনের মৃত্যুর কথা বললেও পরে নিহতের সংখ্যা ২০-তে পৌঁছায় এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরও ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআ ক্ষমতা গ্রহণ করেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। তার প্রশাসন বারবার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। অথচ এই হামলার মাধ্যমে সেই নিরাপত্তার দেয়াল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই হামলা শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং দেশের ‘সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ও জাতীয় ঐক্যের ওপর সরাসরি আঘাত’। তারা এটিকে পরিকল্পিতভাবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর জঙ্গি হামলা বলে চিহ্নিত করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং হামলায় দায়েশের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক মদদ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত গেইর ও. পেডারসেন বলেন, “এটি বর্বরোচিত হামলা। দায়েশের সংশ্লিষ্টতা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী হলেও নিরপেক্ষ তদন্ত আবশ্যক।”
তিনি বলেন, “এই হামলা একটি ভয়াবহ বার্তা বহন করছে-যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নাগরিক স্থাপনা আবারও হামলার ঝুঁকিতে। এটি শুধুই সিরিয়ার সমস্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।”
তুরস্ক, ইরান, ফ্রান্স ও রাশিয়া থেকেও এসেছে তীব্র নিন্দা। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই কাপুরুষোচিত হামলা শুধু দামাস্কাস নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়েশের এই ধরনের সংগঠিত হামলা ইঙ্গিত করে সিরিয়ায় জঙ্গি তৎপরতা পুনরায় মাথাচাড়া দিচ্ছে। এমনও আশঙ্কা করা হচ্ছে, কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি বা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে সংঘর্ষ উসকে দিতে পারে।
আহমেদ আল-শারআ এর আগে জানিয়েছিলেন, “সিরিয়াকে সংখ্যালঘু-বান্ধব, নিরাপদ ও বহুধারার সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।” কিন্তু মার এলিয়াসে রক্তাক্ত রোববার সেই প্রতিশ্রুতিকে বড়সড় প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সিরিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীসহ বড় বড় শহরগুলোতে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। পাশাপাশি দায়েশ ও তাদের স্থানীয় শাখাগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরুর ঘোষণাও এসেছে।
পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন কোনো তৎপরতা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
এক দশকের গৃহযুদ্ধ ও সামরিক দমন-পীড়নের পর সিরিয়া ধীরে ধীরে শান্তির পথে হাঁটছিল। কিন্তু আজকের আত্মঘাতী হামলা আবারও মনে করিয়ে দিল-সন্ত্রাস কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না, বরং প্রতিবার ফিরে আসে নতুন মুখোশে। আর সেই মুখোশের ছায়া আজও অন্ধকার করে তুলছে দামাস্কাসের প্রার্থনার প্রাঙ্গণ।

সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, হোয়াইট হেলমেটস, বিবিসি ও রয়টার্স