রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান প্রক্রিয়া পরিবর্তনের বিষয়ে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ও খ্যাতিমান রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি জনভোট অথবা দ্বিকক্ষীয় পার্লামেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন-এমন একটি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে রাজনৈতিক ঐকমত্য।
বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের চলমান সংলাপের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৃতীয় দিনের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের সামনে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “আজকের আলোচনায় এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান বিধান পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন-এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদের সংস্কার এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।”
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের (Upper House) ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মত, দ্বিকক্ষীয় পার্লামেন্ট চালু হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আরও স্বচ্ছ ও জনগণের প্রত্যাশানুযায়ী হতে পারে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ জানান, “১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং অধিকাংশ দলই এতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”
এই উচ্চকক্ষ কাদের নিয়ে গঠিত হবে-বুদ্ধিজীবী, আঞ্চলিক প্রতিনিধি,সংখ্যালঘু কিংবা সাবেক জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে-সে বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সংলাপে আরেকটি আলোচিত প্রসঙ্গ ছিল প্রধানমন্ত্রীর টার্ম লিমিট। আলী রীয়াজ জানান, অনেক রাজনৈতিক দলই চায়, কোনো ব্যক্তি যেন দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হতে পারেন।
“কিছু দল প্রস্তাব দিয়েছে, একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। এটা গণতন্ত্রের স্থায়ীত্ব এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধে সহায়ক হবে।”
তবে অধ্যাপক রীয়াজ স্পষ্ট করে বলেন, “সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়, সেটি আমরা শুরু থেকেই বলেছি। তবুও, যেসব বিষয়ে ঐক্য হচ্ছে না, সেগুলোকে আমরা নেতিবাচকভাবে না দেখে আলোচনা ও আপোষের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করব।”
তিনি জানান, আলোচনার পরবর্তী পর্ব রোববার সকাল ১০:৩০টায় অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে এই সপ্তাহের আলোচনার অসমাপ্ত ও বিতর্কিত বিষয়ের নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, দ্বিকক্ষ সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে এই সংলাপগুলো ক্রমশ একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর পথ তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত একটি আংশিক সংবিধান সংশোধন বিল কিংবা নতুন একটি জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত গড়াতে পারে।
রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি এক ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে— যেখানে শাসনব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনগণের অংশগ্রহণ নতুন করে সংজ্ঞায়িত হতে পারে।