গাইবান্ধা রেলস্টেশনে স্টেশন মাস্টারকে ঘিরে ধাওয়া-মারধর: ভিডিও ভাইরাল, তীব্র প্রতিক্রিয়া

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৬-১৫ ০০:৪৯:৪১
image

গাইবান্ধা | ১৪ জুন ২০২৫
গাইবান্ধা রেলস্টেশনে এক যাত্রীকে মারধরের ঘটনায় স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেমকে উত্তেজিত জনতা টেনে হিঁচড়ে রেললাইনে নামিয়ে মারধর করেছে। শনিবার দুপুরে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। রেলওয়ে প্রশাসনের নিরব ভূমিকা ও স্টেশন মাস্টারের আচরণ ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকেরা।
শনিবার দুপুরে লালমনিরহাট থেকে ছেড়ে আসা ৭৫২ নম্বর ‘লালমনি এক্সপ্রেস’ গাইবান্ধা স্টেশনে পৌঁছানোর পর এক যাত্রী স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেমের সঙ্গে আসন সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, যাত্রীটি স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটে ট্রেনে আসন না পেয়ে এ বিষয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে জানতে চাইলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে স্টেশন মাস্টার নিজেই যাত্রীর মুখে আঘাত করলে তাঁর নাক ফেটে যায় এবং রক্তপাত হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ওই যাত্রীর স্ত্রী ও আশপাশে থাকা অন্য যাত্রীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর উত্তেজিত জনতা স্টেশন মাস্টারকে টেনে রেললাইনে নামিয়ে মারধর করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং কিছু সময় স্টেশনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার সময় উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন, যা অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, অর্ধনগ্ন অবস্থায় স্টেশন মাস্টারকে রেললাইনের পাশে পড়ে থাকতে এবং যাত্রীরা তাঁকে মারধর করছেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনরা বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য করতে থাকেন। অনেকে রেলওয়ে কর্মীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং সাধারণ যাত্রীদের প্রতি অসদাচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার কেউ কেউ আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানান।
ঘটনার বিষয়ে গাইবান্ধা রেলস্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ (আইসি) ওসমান গনি বলেন, "ঘটনার সূত্রপাত স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেমের আচরণ থেকেই হয়েছে। তিনি নিজেই প্রথমে যাত্রীকে মারধর করেছেন, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।"
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রথমে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। যদিও ভিডিও ফুটেজের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পার হলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রী অধিকার সংগঠনের নেতারা। তাঁরা বলছেন, “রেল স্টেশনে সাধারণ যাত্রীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং কর্মকর্তাদের আচরণ যদি অপেশাদার হয়, তবে এ ধরনের অঘটন বারবার ঘটবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ও প্রতিক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট, জনগণ এখন রেল ব্যবস্থার পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে, ট্রেনের আসন ব্যবস্থা, যাত্রীদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ এবং প্রতিকূল অবস্থায় সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে।
গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের সভাপতি বলেন, “ঘটনার তদন্ত হওয়া জরুরি। শুধু দায়ী যাত্রীদের নয়, যিনি দায়িত্বে থেকেও প্রথমে আঘাত করেছেন-তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
গাইবান্ধা রেলস্টেশনে এই অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের রেলসেবার বর্তমান বাস্তবতা আরও একবার উন্মোচিত হলো। এখন সময় এসেছে যাত্রীসেবা ও রেলওয়ের শৃঙ্খলা পুনর্বিবেচনা করার। সবার প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং উভয় পক্ষের দায় নিরূপণ করে প্রশাসন একটি দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নেবে।