ঢাকা-১৪ জুন ২০২৫
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও পরবর্তী যৌথ বিবৃতিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
শনিবার (১৪ জুন) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই যৌথ বিবৃতিকে “বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যত্যয়” বলে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দলটির দাবি, প্রধান উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা এই ঘটনার মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
জামায়াত পরিষ্কার ভাষায় জানায়, তারেক রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠককে তারা ‘স্বাভাবিক’ বলেই মনে করছে। কারণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে দলটি যৌথ প্রেস ব্রিফিং এবং লিখিত যৌথ বিবৃতি প্রদানের বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য ও রাজনৈতিক শালীনতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এটি শুধু রাজনৈতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করেনি, বরং প্রধান উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি যেন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়েছেন-এমন ধারণা জনগণের মধ্যে জন্ম নিয়েছে।”
ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়।
দলটি দাবি করে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পর আগামী নির্বাচন নিয়ে জনগণের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়,“বাংলাদেশে একাধিক সক্রিয় রাজনৈতিক দল রয়েছে। সেখানে শুধু একটি দলের সঙ্গে বসে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঠিক করে যৌথ বিবৃতি দেওয়া সঠিক নয়। এতে করে নির্বাচন নিয়ে নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।”
জামায়াতের মতে, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হবে।”
যৌথ বিবৃতিতে ২০২৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়।
জামায়াত জানায়, তারা এই সময়সূচির বিরোধিতা করছে না। বরং ইতোমধ্যে দলটির আমির ১৬ এপ্রিলের এক বক্তব্যে রমজানের আগেই নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।
তবে বিবৃতিতে বলা হয়, “নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের আগে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা উচিত ছিল। বিদেশের মাটিতে কেবল একটি দলের সঙ্গে বসে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ও বিবৃতি অনুচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত।”
জামায়াতের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—সরকার ও বিএনপি এখন সমান শক্তির দুই পক্ষ। এতে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।”
দলটি আশা প্রকাশ করেছে, ড. ইউনূস দেশে ফিরে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তায় সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করবেন।
তারা আরও জানায়,
“সরকারের যে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে, তা নিরসনে প্রধান উপদেষ্টাকে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে এই নির্বাচন নিয়েও গণবিশ্বাসে চিড় ধরবে।”
গত ১৩ জুন লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই আলোচিত বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে দুই পক্ষ একটি যৌথ বিবৃতি ও প্রেস ব্রিফিং করেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে এখন নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, সব দলের অংশগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা নির্বাচন চায়, সময় নিয়েও আপত্তি নেই, কিন্তু প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছে।
রাজনীতিতে আস্থার সঙ্কট নতুন নয়। তবে যদি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ব্যক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হন, তাহলে আগামীর নির্বাচন শুধু চ্যালেঞ্জিং নয়, বরং গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে-এই আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক মহলে।
সকালের আলো ডট কম এই সংবেদনশীল ইস্যুতে সব পক্ষের সততা, স্বচ্ছতা ও সংলাপের আহ্বান জানায়।