বিলাসবহুল লন্ডন বাড়ি জব্দ:সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের বিদেশি সম্পদে যুক্তরাজ্যের এনসিএর অভিযান

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-১২ ০০:৪৪:২১
image

বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও শেখ হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা একাধিক মূল্যবান সম্পত্তি জব্দ করেছে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA)। ব্রিটিশ সংস্থাটির এই পদক্ষেপ মূলত বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী গণমাধ্যম আল জাজিরার তদন্ত ইউনিট (I-Unit)।
জানা গেছে, লন্ডনের অন্যতম অভিজাত ও অভ্যিজাত এলাকা সেন্ট জনস উডে অবস্থিত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড মূল্যের একটি প্রাসাদসদৃশ বাড়ি এনসিএর ফ্রিজিং আদেশের আওতায় পড়েছে। এই বাড়িতেই সম্প্রতি ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গোপন সাক্ষাতে নিজের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য করেন সাবেক এই মন্ত্রী।
আল জাজিরার গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত আলোচনায় সাইফুজ্জামান বলেন, “আমি শেখ হাসিনার সন্তানের মতো। উনি জানেন আমি এখানে ব্যবসা করি।” তিনি নিজেকে শেখ হাসিনার ‘পারিবারিক আত্মীয়’ বলেও দাবি করেন এবং যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে নিজের সম্পদের প্রসঙ্গে অহংকার প্রকাশ করেন।
এই বক্তব্যে একদিকে যেমন তার রাজনৈতিক নিকটতা প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে বিদেশে সম্পদের বিষয়েও স্পষ্ট আলোকপাত হয়েছে-যা বাংলাদেশে চলমান অর্থপাচার মামলার আলোকেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউনাইটেড কিংডমের আইন অনুযায়ী, ফ্রিজিং অর্ডার জারি হওয়া মানে হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পদ হস্তান্তর, বিক্রয় বা লাভজনক ব্যবহারের সুযোগ হারান। এনসিএর একজন মুখপাত্র আল জাজিরাকে জানান, “চলমান একটি আইনি তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা কয়েকটি সম্পত্তির ওপর ফ্রিজিং অর্ডার জারি করেছি। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু এখন বলা যাচ্ছে না।”
এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। বিশেষ করে, যখন সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দেশীয় তদন্ত চলছে।
আল জাজিরার অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, লন্ডন ছাড়াও সাইফুজ্জামান চৌধুরী দুবাই ও নিউইয়র্কে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও ব্যবসায়িক স্থাপনা কিনেছেন, যেগুলোর সম্মিলিত মূল্য ৫০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। অথচ এসব সম্পদের একটিও তিনি বাংলাদেশে নিজের আয়কর নথিতে উল্লেখ করেননি।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, একজন নাগরিক বৈধভাবে বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার দেশের বাইরে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সাইফুজ্জামানের এসব বিদেশি বিনিয়োগ শুধুমাত্র অবৈধই নয়, বরং অর্থপাচারের গুরুতর উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গত বছর আগস্টে ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই তার সরকারের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের বিদেশি সম্পদ ও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী তাদেরই একজন, যিনি হাসিনা সরকারের আমলে একাধিক প্রভাবশালী পদে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এনসিএর এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আন্তর্জাতিক সহায়তায় দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের একটি মাইলফলক বলেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এম রহমান বলেন, “যদি উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় এমন সব দুর্নীতিবাজদের সম্পদ আটকানো যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারে এটি সহায়ক হতে পারে।”

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, এনসিএ, চ্যাথাম হাউজ