না-ফেরার দেশে তানিন সুবহা: থেমে গেল এক অসমাপ্ত শিল্পীজীবন

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৫-০৬-১০ ২০:৪৫:২৮
image

শিল্পের মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন তানিন সুবহা—দর্শকের হৃদয়ে সদা জীবন্ত সেই চিত্রনায়িকা আর ফিরবেন না কোনো নতুন চরিত্রে, কোনো আবেগময় সংলাপে। দীর্ঘ আটদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লড়াই চালিয়ে মঙ্গলবার (১০ জুন) সন্ধ্যা ৭টা ৫৭ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩১ বছর।

ক্লিনিক্যালি ডেড' তানিন সুবাহ, লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত স্বামীর  ওপর
জন্ম ১৯৯৪ সালের ৫ মে, মাদারীপুরে। কিন্তু তার জীবনের আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার অভিনয় অঙ্গনে। ২০১৫ সালে আজাদ কালাম পরিচালিত ‘যমজ’ নাটকে মোশাররফ করিমের বিপরীতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মিডিয়ায় যাত্রা শুরু হয় তানিনের। শুরুতেই আলোচনায় আসেন, এরপর একে একে ‘আলাল দুলাল’, ‘সেয়ানা জামাই’, ‘ম্যারেজ মিডিয়া ডটকম’-এর মতো জনপ্রিয় নাটকে তার উপস্থিতি দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
তানিন শুধু ছোট পর্দায় নয়, বড় পর্দাতেও নিজের প্রতিভার ছাপ রাখেন। ‘অবাস্তব ভালোবাসা’, ‘মাটির পরী’, ‘স্বপ্নের সাথী’, ‘দেমাগ’ এবং ‘তুই আমার’-এই চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি অভিনয় করেন প্রধান চরিত্রে। আজকের প্রেক্ষাপটে এসব সিনেমা যেন তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
তবে তার জীবন হঠাৎ করেই থেমে গেল গত ২ জুন। অসুস্থতা নিয়ে প্রথমে একটি ক্লিনিকে, পরে বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত ধানমন্ডির আরেকটি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি। গত ৮ জুন তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে। কিন্তু অবশেষে ১০ জুন সন্ধ্যায় সেই আশঙ্কা সত্যি হয়ে যায়।
তার মৃত্যুতে বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মীরা বলছেন, তিনি ছিলেন মেধাবী, সংগ্রামী ও একান্ত নিজস্ব ঘরানার অভিনেত্রী। পরিচালক আজাদ কালাম বলেন, “তানিনের মতো পরিশ্রমী আর আন্তরিক অভিনেত্রী আজকের দিনে পাওয়া দুষ্কর। তার চলে যাওয়া শুধু ব্যক্তিগত নয়, শিল্পাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি।”
তানিনের অসমাপ্ত কিছু কাজ মুক্তির অপেক্ষায় ছিল, সেগুলো নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রযোজক নুর হোসেন রানা বলেন, “তানিনের একাগ্রতা ও দৃঢ়তা প্রশংসনীয় ছিল। তার অভিনীত একটি সিনেমা এখন পোস্ট-প্রোডাকশনে রয়েছে। দর্শক যদি তা দেখতে পান, তাহলে বুঝবেন-তানিনের মধ্যে কত বড় সম্ভাবনা ছিল।”

অবশেষে না ফেরার দেশে চিত্রনায়িকা তানিন সুবাহ
এত অল্প বয়সে, এত স্বল্প সময়ের মধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়া এই অভিনেত্রীর বিদায়ে যেন আবারও প্রশ্ন জেগে উঠেছে-কতটা মূল্য আমরা দিতে পারি একজন শিল্পীর জীবনের প্রতি?
আজ তানিন নেই, কিন্তু তার কাজ, তার উপস্থিতি, তার ভক্তদের ভালোবাসা থেকে যাবে অনেক দিন। হয়তো একদিন তার নামটি উচ্চারণ করবে কেউ, মঞ্চে বা সিনেমার পর্দায়-তখন ছায়ার মতো ফিরে আসবে তার মুখাবয়ব, তার চরিত্র।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আজ এক অন্ধকারের রাত নেমেছে-এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নবতী নায়িকার না বলা গল্পের ইতি।