ইতালিতে নাগরিকত্ব ও শ্রম অধিকার নিয়ে গণভোটে ভরাডুবি:মেলোনির কৌশল সফল,গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৬-১০ ০০:৫৮:০৪
image

নাগরিকত্ব সহজীকরণ ও শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় ইতালিতে আয়োজিত বহুল প্রত্যাশিত গণভোট ভোটার অনুপস্থিতির কারণে ব্যর্থ হয়েছে, যা ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফলাফল শুধু সরকারের কৌশলের সাফল্য নয়, বরং ইতালির গণতান্ত্রিক চর্চার এক গভীর সংকেত।
দুই দিনব্যাপী গণভোটে অংশ নেওয়ার হার মাত্র ৩০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে বৈধতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত ৫০ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ। ফলে ছয়টি প্রস্তাবনার কোনোটি আইনগতভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ পায়নি।
এই ফলাফল প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। কারণ, শুরু থেকেই তিনি ও তার দল 'ব্রাদার্স অব ইতালি' এই গণভোটকে অপ্রয়োজনীয় বলে চিহ্নিত করে ভোটারদের অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সরকারের ঘনিষ্ঠ সিনেটর জিওভানবাতিস্তা ফাজ্জোলারি খোলাখুলি বলেন, “বামপন্থীরা এই গণভোটকে সরকারের বিরুদ্ধে গণ-রায় বানাতে চেয়েছিল। বাস্তবতা হলো-জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।”
গণভোটে ছয়টি প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির শর্ত শিথিল করা-যেখানে ইইউ-বহির্ভূত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর নাগরিকত্ব পেতে বর্তমানে ১০ বছর বসবাসের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা ৫ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল।
বাকি প্রস্তাবগুলো শ্রমজীবী জনগণের সুরক্ষা ঘিরে, যেখানে ছিল-
সহজে ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা
অনিশ্চিত চুক্তির সংস্কারের প্রস্তাব
শ্রম দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন
তৃণমূল থেকে উঠে আসা গণআন্দোলনের ব্যর্থতা

এই গণভোটের উদ্যোগ নিয়েছিল বামঘেঁষা তৃণমূল আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ও ইতালির বৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন ‘সিজিআইএল’, যার নেতৃত্বে ছিলেন মহাসচিব মরিসিও লানদিনি। তিনি এই ফলাফলকে ‘গণতান্ত্রিক সংকটের ইঙ্গিত’ বলে মন্তব্য করেন।
“মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করা এখন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে-এটা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ বার্তা।”
মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি) এই গণভোটে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিয়েছিল। নেতৃত্বে থাকা এলিরি স্ক্লাইন এই উদ্যোগকে একদিকে অভিবাসী-সমর্থক নীতি, অন্যদিকে শ্রমিক অধিকারের পক্ষে লড়াই হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন।
কিন্তু ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় দলটি রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছে। এই ব্যর্থতা তাদের সমর্থনভিত্তি কতটা দুর্বল তা স্পষ্ট করে দিয়েছে-বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন তারা মেলোনির জনপ্রিয় ডানপন্থী জোটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গড়তে চাইছিল।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি বরাবরই অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে আলোচিত। তার দল অভিবাসীদের নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এমনকি এখনো ইতালিতে জন্ম নেওয়া বিদেশি বংশোদ্ভূত শিশুরাও ১৮ বছর না হলে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারে না-যা ইউরোপের অন্য দেশের তুলনায় অনেক কঠিন।
এই গণভোটে পরিবর্তন এলে ইতালি জার্মানি ও ফ্রান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন পেত। কিন্তু মেলোনির বিরোধিতা, কৌশলী বয়কট আহ্বান এবং জনসংখ্যার উদাসীনতা এই পরিবর্তনের পথে এক প্রাচীর গড়ে দিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট হচ্ছে জনগণের শক্তির প্রকাশ। কিন্তু জনগণই যদি ভোট দিতে না যায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রে আইন বা নেতৃত্বের প্রশ্নে কাদের প্রতিনিধি হয়ে সরকার কাজ করছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এই ভোটে ব্যর্থতা শুধুই অভিবাসী বা শ্রমিকদের বিষয় নয়, বরং ইতালির নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মানসিকতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
ইতালির এই গণভোট দেখিয়ে দিল, গণতন্ত্রে কখনও কখনও ভোট না দেওয়াও এক ধরনের ভোট। আর সেই ভোট যদি সচেতনভাবে সংগঠিত হয়, তখন তা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মেলোনির দল সেটাই প্রমাণ করল-গণভোটে অংশ না নিয়েই বিরোধীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়-এই কৌশলিক জয় কি গণতন্ত্রের হার নয়?