রোমাঞ্চ ও ভালোবাসার স্মৃতিময় সময় হিসেবে পরিকল্পিত ছিল তাদের হানিমুন। কিন্তু সেই ভ্রমণই পরিণত হলো এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের ব্যবসায়ী রাজা রঘুবংশীর (৩০) মেঘালয়ের পাহাড়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় নাটকীয় মোড় নেয় যখন পুলিশ জানতে পারে-এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আর কেউ নন, তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী সোনম রঘুবংশী।
ঘটনার পর সোনমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে গত সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর থেকে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোনম নিজেই স্বীকার করেন, স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা তিনিই করেছিলেন এবং এজন্য ভাড়া করেছিলেন তিনজন খুনি।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, সোনমের সঙ্গে রাজ কুশওয়াহা নামের এক ব্যক্তির দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পরও এই সম্পর্ক চলতে থাকায় স্বামীকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে সোনম পরিকল্পিতভাবে এই হত্যার ছক আঁকেন।
মেঘালয়ের পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজিপি) ইদাশিশা নোংরাং জানান, সোনমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর অভিযান চালিয়ে তিনজন ভাড়াটে খুনিকে গ্রেফতার করা হয়-একজন উত্তরপ্রদেশ থেকে এবং বাকি দুজন ইন্দোর থেকে। অভিযুক্তরা পুলিশের জেরায় স্বীকার করেছে, সোনমই তাদের টাকা দিয়ে হত্যা করতে পাঠিয়েছিলেন।
পুলিশ জানায়, নবদম্পতি ২৩ মে চেরাপুঞ্জির পূর্ব খাসি পাহাড়ে ভ্রমণে যান। এর আগের দিন নংরিয়াতে পৌঁছান, এবং ২৩ তারিখ হোমস্টে থেকে চেক-আউট করার পর থেকেই তারা নিখোঁজ ছিলেন।
পরদিন তাদের ভাড়া করা স্কুটারটি এক পরিত্যক্ত এলাকায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, কিন্তু কোনো খোঁজ মেলেনি দম্পতির।
অবশেষে ১০ দিন পর, ১ জুন, রাজা রঘুবংশীর গলাকাটা মরদেহ পাওয়া যায় ওয়েইসডং পার্কিং লটের নিচের একটি গভীর খাদে। ঘটনাস্থলেই পাওয়া যায় একটি ধারালো ছুরি, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমা এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “মাত্র সাত দিনের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মেঘালয় পুলিশ অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেছে, তিন আততায়ী গ্রেফতার হয়েছে, আরেকজন পলাতককে ধরার জন্য অভিযান চলছে।”
এই নির্মম ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি সম্পর্কের নামে আড়ালে গড়ে ওঠা বিশ্বাসঘাতকতার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। সমাজে যেখানে বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক, সেখানে প্রেমের মোহে পড়ে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেন-এটি শুধু পরিবার নয়, সম্পর্কের ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলী-
২২ মে: রাজা ও সোনম নংরিয়াতে পৌঁছান।
২৩ মে: হোমস্টে থেকে চেক-আউট করেন, এরপর থেকে নিখোঁজ।
২৪ মে: স্কুটার উদ্ধার।
১ জুন: রাজার মরদেহ খাদে পাওয়া যায়।
৫ জুন: সোনম গাজিপুর থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার।
৬ জুন: সোনমের স্বীকারোক্তি ও তিন অভিযুক্ত গ্রেফতার।
একটি হাসিমুখের ছবিতে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্র। হানিমুনে গিয়ে ভালোবাসার মানুষই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর কারণ-মেঘালয়ের পাহাড়ে যা ঘটল, তা নিছক একটি অপরাধ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, ভালোবাসা ও নৈতিকতা নিয়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।