গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ত্রাণ বহনকারী ব্রিটিশ পতাকাবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’কে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থামিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি নৌবাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয়েছে জাহাজটির ১২ সদস্যের পুরো ক্রু, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনের নেত্রী গ্রেটা থুনবার্গ এবং ফ্রান্সের এমপি ও ফিলিস্তিনপন্থী মানবাধিকার কর্মী রিমা হাসান।
ঘটনাটি ঘটে রোববার (৮ জুন) দিবাগত রাত ২টার দিকে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা জোট ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের (FFC) ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই মিশনটি গাজার অবরুদ্ধ উপকূলে পৌঁছাতে না পারলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে বলেছে, “সেলিব্রেটিদের বহনকারী সেলফি জাহাজটিকে উপকূলে নিয়ে আসা হয়েছে। যাত্রীরা নিরাপদে আমাদের হেফাজতে আছেন। তাদের স্যান্ডউইচ ও পানি সরবরাহ করা হয়েছে। নাটক শেষ।”
এই মন্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক ও মানবিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৯ মার্চ যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙে গাজায় নতুন করে আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে খাদ্য, পানি, ওষুধসহ প্রায় সবধরনের ত্রাণ প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজাকে ‘মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে’ বললেও, ত্রাণের প্রবেশে এখনো ইসরায়েলের কড়াকড়ি অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ১ জুন ইতালির সিসিলি উপকূল থেকে রওনা দেয় ছোট আকারের জাহাজ ‘ম্যাডলিন’। তাতে শিশুদের খাদ্যসামগ্রী, শুকনা খাবার এবং ওষুধ ছিল, যেগুলো সরাসরি গাজার উপকূলে পৌঁছানোর কথা ছিল। যদিও ইসরায়েল ২০০৭ সাল থেকে গাজার উপকূলীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এমপি রিমা হাসান বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছিলাম, কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড করিনি। শুধুই ত্রাণ নিয়ে গাজায় পৌঁছাতে চেয়েছিলাম।”
এদিকে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা অ্যালবানেজ এই ঘটনাকে মানবিক সহায়তার ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, “ম্যাডলিনের যাত্রা হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু গাজার পাশে দাঁড়ানোর এই প্রচেষ্টা থামবে না।”
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটককৃত ত্রাণ ‘মানবিক চ্যানেলের মাধ্যমে গাজায় পৌঁছে দেওয়া হবে’। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে।
এই অভিযানের মাধ্যমে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের দীর্ঘদিনের মানবিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজনমত সৃষ্টি ও মিডিয়া মনোযোগ আকর্ষণে এই মিশন সফল হলেও, ইসরায়েলি দমননীতির মুখে এমন উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে-তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
ইসরায়েলি বিবৃতিতে ত্রাণমিশনকে ‘নাটক’ আখ্যা দেওয়ার পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্রেটা থুনবার্গের লাখো অনুসারী একে মানবিক বিবেকের অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। টুইটারে #FreeMadeline ও #SolidarityWithGaza হ্যাশট্যাগে লাখো পোস্ট হয়েছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।
সম্পাদকীয় মন্তব্য: কেবল জাহাজ নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হলো ইসরায়েলের মানবিক নীতি
বিশ্ব সম্প্রদায় যখন গাজায় চলমান সংকটকে মানবিক বিপর্যয় বলছে, তখন একটি ছোট ত্রাণবাহী জাহাজ থামিয়ে দেওয়া শুধু একটি অভিযান নয়, এটি বিশ্বনীতিতে মানবতা বনাম ভূরাজনীতির সংঘাতের প্রতিচ্ছবি।
এফএফসি-র বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতেও ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন উপকূল থেকে আরও ত্রাণ জাহাজ রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।