হজ মৌসুমে চাপ সামাল দিতে ১৪ দেশের ওয়ার্ক-ওমরাহ ভিসা স্থগিত,তালিকায় বাংলাদেশও

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৫-০৬-০৮ ১৭:১২:৫৯
image

৩১ মে থেকে কার্যকর হয়েছে সৌদি আরব সরকারের নতুন এক সিদ্ধান্ত, যার আওতায় বাংলাদেশসহ মোট ১৪ দেশের নাগরিকদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওয়ার্ক ও ওমরাহ ভিসা প্রদান। একইসঙ্গে পারিবারিক ভিসা নিয়েও কঠোরতা আরোপ করেছে দেশটি। নতুন করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে ৩০ জুন পর্যন্ত।
বিশ্বজুড়ে কর্মপ্রত্যাশী ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা, বিশেষত হজ মৌসুমের ব্যস্ততার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত এসেছে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে।
সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ঘোষিত এই সাময়িক স্থগিতাদেশে যেসব দেশ রয়েছে-তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে: পাকিস্তান, ভারত, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, নাইজেরিয়া, জর্ডান, আলজেরিয়া, সুদান, ইথিওপিয়া, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন এবং মরক্কো।
এই দেশগুলোর আবেদনকারীরা জুন মাসজুড়ে নতুন কোনো ওয়ার্ক বা ওমরাহ ভিসা পাবেন না। শুধু তাই নয়, ৩১ মে’র আগে যাদের ভিসা ইস্যু হয়েছে, তারা এখনও সৌদি আরবে প্রবেশ না করলে চলতি স্থগিতাদেশ চলাকালে বাধার সম্মুখীন হতে পারেন।
সৌদি সরকার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের হজ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এবং বিপুল সংখ্যক হজযাত্রীর আগমন ও প্রস্থানের সময় যেন দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশৃঙ্খলা না তৈরি হয়-সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ।
৪ জুন শুরু হওয়া হজযাত্রা শেষ হয়েছে ৭ জুন। তবে হজ পালন শেষে হাজিদের সৌদি ত্যাগ করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। জুনের শেষ নাগাদ অধিকাংশ হজযাত্রী নিজ দেশে ফিরবেন।
এই সময়টিকে সৌদি সরকার 'সেন্সিটিভ পিরিয়ড' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোর উপর বাড়তি চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে সাময়িকভাবে ওয়ার্ক ও ওমরাহ ভিসা বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে যেতে আবেদন করেন। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই সৌদি ওয়ার্ক ভিসার জন্য কয়েক হাজার আবেদন জমা পড়েছে।
এমন এক সময়ে এই স্থগিতাদেশ এলো, যখন অনেকে সৌদিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমনকি অনেকে টিকিট কেটেছেন, মেডিকেল পরীক্ষা দিয়েছেন এবং নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছেন।
সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই সব মানুষ, যারা জুনে দেশটি ভ্রমণের পরিকল্পনায় ছিলেন। বিশেষ করে যারা ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বা পরিবার নিয়ে সৌদি যাওয়ার কথা ভাবছিলেন-তাদের সামনে এখন অনিশ্চয়তার দেয়াল।
সৌদির মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যাদের ভিসা ইতোমধ্যে ইস্যু হয়েছে, তারা এই স্থগিতাদেশ চলাকালে সৌদিতে প্রবেশ করতে গেলেও বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কঠোরভাবে ভিসার তারিখ ও প্রবেশ অনুমতি যাচাই করবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র ভিসা থাকলেই চলবে না-পর্যবেক্ষণ চলাকালে সৌদিতে প্রবেশ করতে হলে প্রয়োজন পড়বে বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের। অনেকের হয়তো ফ্লাইট বাতিল হবে, অনেকে ফেরত পাঠানোর শঙ্কায়ও পড়তে পারেন।
এই স্থগিতাদেশের ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ভিসা দালাল চক্রগুলোও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, তারা ভিসা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন।
এছাড়া হজ মৌসুম শেষে সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি ভিসা কার্যক্রম দ্রুত চালু না করে, তাহলে এর প্রভাব জুলাই ও আগস্টের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াতেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ যেন এই সময়ে সৌদি ভিসা সংক্রান্ত কোনো লেনদেনে না জড়ায় এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা গ্রহণের আগে সৌদি দূতাবাস বা প্রবাসী কল্যাণ দফতরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করে।
সাবধানতা ও সচেতনতার এই সময়ে ভিসা প্রত্যাশীদের ধৈর্য ধরাই এখন একমাত্র উপায়। সৌদি সরকারের ঘোষিত এই সাময়িক বিধিনিষেধ হয়তো আগামী দিনে হজ-পরবর্তী স্বাভাবিকতা ফেরার পরই উঠবে-সেই আশাতেই আপাতত অপেক্ষা।