ঢাকা| ৭ জুন ২০২৫
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সীমান্ত উত্তেজনার নতুন রূপ পেল থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এক কম্বোডীয় সেনা নিহত হওয়ার পর শনিবার থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
গত ২৮ মে, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত ‘এমারাল্ড ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চলে হঠাৎ করে দুদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। এ ঘটনায় এক কম্বোডীয় সেনা নিহত হন, যা এই অঞ্চলে সাম্প্রতিককালের অন্যতম জোরালো সামরিক মুখোমুখি সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত।
যদিও শুরুতে উভয় দেশই উত্তেজনা প্রশমনে সম্মত হয়, পরবর্তীতে কম্বোডিয়া জানায় যে, তারা ওই এলাকায় সেনা মোতায়েন রাখবে। থাইল্যান্ড এই পদক্ষেপকে 'সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি' হিসেবে দেখছে।
থাইল্যান্ডের রয়াল থাই আর্মি এক বিবৃতিতে জানায়, তারা এখন থেকে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ খোলার এবং বন্ধ রাখার বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। শনিবারের ঘোষণায় বলা হয়-
পশ্চিমাঞ্চলীয় পোইপেত ও দক্ষিণ-পূর্ব আরণ্যপ্রতেত সীমান্তপথে ছয় চাকা যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সীমান্ত পারাপারের সময়সূচিও কমিয়ে আনা হয়েছে।
শুধুমাত্র কর্ম ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দুই দেশের নাগরিকদের সীমিত যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
থাই–কম্বোডিয়া সীমান্তের পোইপেত চেকপয়েন্টটি সবচেয়ে ব্যস্ত সীমান্ত পয়েন্ট, যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করেন, যার মধ্যে অনেক থাই নাগরিক কম্বোডিয়ার ক্যাসিনো ও পর্যটন এলাকায় যান। এই সীমান্ত বন্ধের ফলে পর্যটন ও বাণিজ্যিক যাতায়াতে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়াল থাই আর্মি আরও জানিয়েছে, কম্বোডিয়ান শ্রমিকরা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাইল্যান্ডে ঢুকতে পারবেন, তবে ভিন্ন এলাকার জন্য ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
২০০৮ সালে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত এলাকায় প্রথমবারের মতো সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক রায়ে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটি কম্বোডিয়ার বলে ঘোষণা করলেও থাইল্যান্ড আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করেনি। এই পরিস্থিতিই বর্তমানে আবার নতুন করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই শনিবারের বিবৃতিতে বলেন,
"কম্বোডিয়ার সেনা প্রত্যাহার না করাটা গভীরভাবে হতাশাজনক।"
অন্যদিকে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানে জানিয়েছেন, সীমান্ত বিরোধ মেটাতে তারা আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নেবে, এবং আইসিজেতে পুনরায় অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সীমান্ত সংকট সমাধানের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহেই যৌথ সীমান্ত কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে থাই কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই বৈঠকেই পরিস্থিতি শান্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্পাদকীয় মন্তব্যঃ এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করে, আঞ্চলিক সীমান্ত বিরোধ শুধু সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও জটিল হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ থাকবে কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর।