‘মেগা প্রকল্প নয়, ছিল মেগা লুটপাট’-জাতির উদ্দেশে ড. ইউনূসের বিস্ফোরক ভাষণ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৬-০৬ ১৯:৩৫:৫৪
image

ঢাকা | ৬ জুন ২০২৫
বিগত সরকারগুলোর অর্থনৈতিক নীতিকে সরাসরি দায়ী করে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুক্রবার (৬ জুন) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, “দেশের মানুষকে লুটপাটতন্ত্র থেকে মুক্ত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
জাতির উদ্দেশে এমন বিস্ফোরক ও স্পষ্টভাষী বক্তব্য অনেক দিন পর শুনেছে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ‘ভৌতিক ব্যয়’ এবং ‘মেগা লুটপাট’-এর অভিযোগ তুলে তিনি জানান, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যয়সংকোচন ও ঋণমুক্তি কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ড. ইউনূস ভাষণে সরাসরি বলেন, “আপনারা জানেন, বিগত ১৬ বছরে উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্প নিয়ে কী পরিমাণ লুটপাট হয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলো যেন হয়ে উঠেছিল মেগা ডাকাতির প্রকল্প।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেল মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ—এই পাঁচটি খাতে সরকার ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে ৪৬ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
এই বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো পেয়েছি, যার কেন্দ্রে ছিল বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ, অপচয় ও দুর্নীতির স্থায়ী রূপ। লুটপাটতন্ত্র যদি চালু থাকে, তাহলে কোনো সরকারই দেশের স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না।”
তিনি আরও জানান, অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ড. ইউনূসের ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে। তিনি বলেন, “দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে আমাদের গুরুত্ব দিতেই হবে। তা না হলে এদেশকে আমরা যে স্থানে নিয়ে যেতে চাই, সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।”
তিনি দাবি করেন, এই লক্ষ্য পূরণে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা সরকারকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।
ড. ইউনূস ভাষণে অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়েও ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যয় হ্রাস নয়, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। দায়িত্বশীলতা না থাকলে উন্নয়নও টেকসই হয় না।”
সরকারের নীতিতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে যে প্রচেষ্টা নেওয়া হচ্ছে, তার ফল এখন দৃশ্যমান হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে ‘মেগা ডাকাতি’, ‘ভৌতিক ব্যয়’ ও ‘লুটপাটতন্ত্র’-এই শব্দগুলো ব্যবহার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াবে বলেই ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। এই বক্তব্যের পর সংসদে বা সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে যেখানে এই ভাষণ বর্তমান সরকারের কড়াকড়ি মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে এটি পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীনদের সরাসরি অভিযুক্ত করেও জনমত গঠনের চেষ্টা।
ড. ইউনূসের এই ভাষণ তার সরকারের পক্ষ থেকে এক স্পষ্ট বার্তা-আরও জবাবদিহি, আরও স্বচ্ছতা, এবং কোনোভাবেই লুটপাটকে ছাড় নয়। যদিও বাস্তবায়নের পথে আছে বহু চ্যালেঞ্জ, তবে এমন একটি সরাসরি ও নির্লিপ্ত বক্তব্য অনেকটাই বিরল বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে।
পরবর্তী বাজেট ও রূপকল্পে এই বক্তব্য কতটা প্রতিফলিত হবে, এখন সে দিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী।