ভোগান্তির ঈদযাত্রা:ঘরমুখো মানুষের ঢল,বাস নেই,বাড়তি ভাড়া-অব্যবস্থার চক্রে বন্দি মহাখালী টার্মিনাল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৬-০৬ ১৫:৫৭:০৯
image

৬জুন ২০২৫, মহাখালী, ঢাকা
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফেরা। কিন্তু এই ফেরার পথে রাজধানীর বাস টার্মিনালে যে চিত্র ধরা পড়ে, তা যেন এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। শনিবার সকাল থেকে মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে ভিড় জমিয়েছে হাজার হাজার মানুষ-সবার চোখে একটাই লক্ষ্য, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের কোলাকুলি। তবে বাসের জন্য তাদের অপেক্ষার প্রহর যেন ঈদের খুশিকে রীতিমতো যন্ত্রণায় পরিণত করছে।
সকাল ৭টার আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে টার্মিনাল এলাকা। যাত্রীরা দল বেঁধে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বা একা এসে দাঁড়ান লাইনে। কিন্তু বাস নেই। যারা পাঁচ দিন আগে টিকিট কিনেছিলেন তারাও হতাশায় পা ছড়ান টার্মিনালের কংক্রিটে।
বাস আছে, নেই সময়মতো, আর সময়মতো এলে নেই সিট
ময়মনসিংহগামী যাত্রী নজরুল ইসলাম ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে বলেন, “৯টার বাসের টিকিট ছিল, এখন বাজে ১১টা। একটার পর একটা বাস যাচ্ছে, কিন্তু আমাদেরটা আসে না। জিজ্ঞেস করলে বলে-রাস্তায় জ্যামে।”
টাঙ্গাইলগামী নুপুর আক্তার নিজের শিশুকে কোলে নিয়ে বললেন, “বাচ্চা, ব্যাগ, গরম সবকিছু মিলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ফুলে গেছে। টিকিট আগে কেটেও যদি বসে থাকি, তাহলে আগেভাগে কেন কিনলাম?”
সুপারভাইজারদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাস কম থাকার পেছনে নানা কারণ-অনেক মালিক ঈদের রাস্তায় যানজট এড়াতে রুটে নামায়নি, আবার কিছু বাস যান্ত্রিক সমস্যায়। চালকের সংকটও একটা বড় কারণ।”
তিনি একরকম মেনে নেন, “ভাড়াও কেউ কেউ বাড়িয়ে নিচ্ছে। আমরা চেষ্টা করি ব্যবস্থা নিতে, কিন্তু উৎসবের সময় এত চাপ থাকে যে সবকিছু সামলানো কঠিন।”
যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়া উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ২০০-৩০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পরিবহনগুলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী যাত্রী আরাফাত হোসেন বলেন, “প্রতিবারই একই অবস্থা। ৩৫০ টাকার টিকিট আজ ৬৫০ টাকায় নিয়েছি। কেউ দেখতে আসে না যে আমরা কতটা কষ্ট করে বাড়ি যাচ্ছি।”
কথা বলার সময় তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। সাদামাটা পোশাকে ধুঁকতে ধুঁকতে তিনি বললেন, “যাব নওগাঁ। টিকিট পাই নাই। দুইজন লোক ৮০০ চাইল, যাই কই!”
এদিন সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অভিযানে নামে টার্মিনালে। তাদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একাধিক পরিবহনকে জরিমানা করাও হয়।
কিন্তু যাত্রীরা বলছেন, “এই অভিযানগুলো চোখে ধুলো দেওয়ার মতো। দুই-চারটা বাসে জরিমানা দিয়ে শেষ। বাকি বাসগুলো তখন অন্য জায়গা থেকে যাত্রী উঠায় বাড়তি ভাড়ায়।”
এই চিত্র শুধু যানজট বা সময়সূচির ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। ভাড়ার লাগাম টানতে নিয়মিত মনিটরিং নেই, পূর্বপরিকল্পিত সমন্বয়হীন, আর টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় নজরদারির অভাব প্রবল। তারই খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এই শহরে ঈদে বাড়ি ফেরা যেন কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক অসম যুদ্ধ। যেখানে প্রতিটি মানুষ তার সময়, অর্থ ও শারীরিক শ্রম ব্যয় করে তবুও সম্মানজনক যাত্রা পায় না। প্রতি ঈদেই একই ভোগান্তি, অভিযোগ, অভিযান আর আশ্বাস। সমাধান নেই।
“বাড়ি তো যাবোই, মরলেও বাড়ি যাব। অন্তত জানাজা হবে আত্মীয়দের সামনে”-বলেই ফুঁপিয়ে ওঠেন বৃদ্ধ সোলায়মান মিয়া, যিনি সিরাজগঞ্জ যাচ্ছেন স্ত্রীর জন্য নিয়ে যাওয়া কোরবানির মাংসের আশায়।
ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ। অথচ এই যাত্রা বারবার পরিণত হয় অসহনীয় দুর্ভোগে। টার্মিনালভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলাহীনতা ও দায়মুক্ত ভাড়াবৃদ্ধি বন্ধ না হলে, এই ঈদযাত্রা কেবল প্রতিবছরের নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় পরিণত হবে।