বেনাপোল, ৫ জুন ২০২৫
রাজনৈতিক প্রভাব, জনপ্রতিনিধিত্বের চেহারা এবং বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে বিদেশে পলায়ন-সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আবারও আলোচনায় উঠে এলো রাজনৈতিক ব্যক্তির পলায়নের চেষ্টার ঘটনা। ভারতের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে গিয়ে যশোরের বেনাপোল ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে ধরা পড়েছেন বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও গাওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ রেজাউল কবির।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বেনাপোল ইমিগ্রেশন অফিসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর স্ক্যানিংয়ে উদ্ঘাটিত হয় তার বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলার তথ্য। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তাকে আটক করে এবং পরে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করে।
আটক শেখ রেজাউল কবির (পাসপোর্ট নম্বর: A00953915) বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার চাঁদেরহাট গ্রামের মৃত মুকবুল শেখের ছেলে। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান।
বেনাপোল ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন মুন্সি জানান, “আমরা আগে থেকেই ধারণা করছিলাম, শেখ রেজাউল ভারতের পথে পালাতে পারেন। তার গতিবিধি নিয়ে নজরদারি ছিল। পাসপোর্ট স্ক্যান করার পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্য নিশ্চিত হয়। এরপরই তাকে আটক করা হয়।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শেখ রেজাউল কবিরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটি (মামলা নম্বর ২১, তারিখ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪) রুজু হয়েছে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির আটটি ভিন্ন ধারায়। যার মধ্যে রয়েছে:
১৪৩ ধারা: অবৈধ সমাবেশ
৩৪১-৩৪২ ধারা: অবাধ চলাচলে বাধা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখা
৩২৩ ও ৩০৭ ধারা: শারীরিক আঘাত এবং হত্যাচেষ্টা
৩৮৬ ধারা: চাঁদাবাজি
৫০৬ ও ৫০২ ধারা: হুমকি প্রদান ও মিথ্যা তথ্য প্রচার
এতসব গুরুতর ধারার মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এখনো চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মো. রাসেল মিয়া বলেন, “আটকের পর শেখ রেজাউলকে থানায় রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাকে মোল্লাহাট থানায় হস্তান্তর করা হবে।”
ঘটনার পর মোল্লাহাট ও বাগেরহাটের স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের একাংশ বলছে, শেখ রেজাউলের কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত ছিল। দলীয় পদ হারানোর পরেও তিনি স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা এক প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী বলেন, “জনপ্রতিনিধির ছায়ায় থেকে অনেকেই দখল, হুমকি আর দুর্নীতির রুট তৈরি করে ফেলে। কিন্তু আইনের হাত যখন পেছনে লাগে, তখনই বোঝা যায়-ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।”
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী জনপ্রতিনিধিদের বিদেশ পালানোর চেষ্টার ঘটনা এর আগেও দেখা গেছে। তবে পাসপোর্ট স্ক্যানিংয়ে তথ্য বেরিয়ে আসার মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ইতিবাচক দিকও তুলে ধরছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনপ্রতিনিধিরা যখন আইন থেকে বাঁচতে সীমান্তে ধরা পড়েন, তখন সেটা শুধু একজন ব্যক্তির নয়-পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা ফুটে ওঠে। এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মনিটরিং কী পর্যায়ে হয়? এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি কতটা কার্যকর?