সমাজের প্রতিচ্ছবি ও উত্তরণের পথ

  • জাহাঙ্গীর বাবু
  • ২০২৫-০৬-০৫ ১৫:১৫:৫৯
image

সমাজের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের চিন্তা, চর্চা ও সংস্কৃতির ফল। যখন একটি সমাজ ব্যর্থতার আবর্তে আটকে যায়, তখন সেখানে জ্ঞান, বিচার-বিবেচনা ও নৈতিকতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যর্থ সমাজের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে—অসচেতনতা, মূল্যহীন বিনোদন, দুর্নীতির উল্লাস, শিক্ষার প্রতি অবহেলা এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিদের প্রতি অসম্মান।

হুজুগের সমাজে মুক্তচিন্তার সংকট
একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হলো মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু ব্যর্থ সমাজে মানুষ জ্ঞানের আলোয় নয়, হুজুগে জাগে। বই পড়ার অভ্যাস সেখানে দুর্বল, বিজ্ঞানচর্চা উপেক্ষিত, এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে সমাজে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রসার ঘটে, যা যুক্তিবাদী আলোচনাকে দুর্বল করে তোলে। বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠ সেখানে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, এবং কথার চেয়ে চিৎকারই হয়ে ওঠে সমাজের ভাষা।

সস্তা বিনোদনের প্রাধান্য
অর্থহীন বিনোদনের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্তি ব্যর্থ সমাজের অন্যতম লক্ষণ। সেখানে গবেষণা, চিন্তাশীলতা কিংবা মননশীল কাজের চর্চা চাপা পড়ে যায় জনপ্রিয়তার নিচে। টিকটক, ইউটিউব শর্টস বা নাটকের নাম করে বিকৃত কনটেন্ট হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের প্রধান খাদ্য। চিন্তাশীল কেউ জনপ্রিয় হয় না—চিৎকারে, নাচে কিংবা হাসির ক্লিপে ‘ভাইরাল’ হওয়ার নামেই মাপকাঠি নির্ধারিত হয়।
ফলে সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভোগবাদিতা সমাজে এমন একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে প্রকৃত শিক্ষা ও শৃঙ্খলা মূল্যহীন হয়ে পড়ে

দুর্নীতির উল্লাস ও মূল্যবোধের ক্ষয়
যে সমাজে দুর্নীতিবাজরা সফল হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে নৈতিকতার চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থ, ক্ষমতা ও পদবী অর্জনই সেখানে ‘স্মার্টনেস’ ও ‘সফলতা’র মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
সৎ ও মেধাবী মানুষ সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যায়, আর দালালতন্ত্র ও তোষামোদি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভ্রান্ত মূল্যবোধকে গ্রহণ করে, এবং তা সমাজের ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে থাকে।

যুবসমাজের লক্ষ্যহীনতা, রাজনৈতিক ব্যবহারের ফাঁদ ও গবেষণার ঘাটতি
বিশ্বজুড়ে যখন তরুণেরা নতুন নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও গবেষণায় নিজেদের নিয়োজিত করছে—বাংলাদেশের যুবসমাজের একটি বড় অংশ পথ হারিয়ে ফেলছে।
বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ক্লাইমেট টেক, স্পেস রিসার্চে প্রতিনিয়ত হাজারো নতুন গবেষণা হচ্ছে। গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, স্পেসএক্সে বাংলাদেশি তরুণদেরও কিছু গর্বের নাম আছে। কিন্তু দেশের ভিতরে সেই গবেষণা-ভিত্তিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ০.০৩% গবেষণায় ব্যয় হয়—যা পৃথিবীর সর্বনিম্নের মধ্যে পড়ে। ফলে হাজার হাজার তরুণ মোবাইল গেম, ফেসবুক-ইউটিউবে দিন কাটিয়ে দেয়, অল্প শিক্ষার পর ঝরে পড়ে, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
অন্যদিকে, ছাত্রাবস্থায় অনেক তরুণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। তারা আদর্শ নয়, অনুসরণ করে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার কৌশল। রাজনীতিতে প্রবেশের পরে তারা চাঁদাবাজি, লাঠিয়াল বাহিনী, মিছিল-অবরোধে জড়িয়ে পড়ে। সরকারের সদিচ্ছা কিংবা কার্যকর বিরোধী দলের অভাবে, আন্দোলন ও দাবি আদায়ের নামে বিশাল ছাত্রসমাজ রাজপথে নামে—কিন্তু আর শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যায় না।
তারা হয়ে পড়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার, আর তাদের চিন্তা গ্রাস করে অর্থ ও ক্ষমতার লোভ।
তারা আর বইয়ের কাছে ফেরে না, তারা আর গবেষণাগারে যায় না—তারা যায় শ্লোগানের পেছনে।
ফলে একদিকে তরুণদের মেধা নষ্ট হয়, অন্যদিকে সমাজ হারায় সম্ভাব্য নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের পথপ্রদর্শক।

উত্তরণের পথ
সমাজের এই ব্যর্থতা থেকে মুক্তি কোনো অলৌকিক উপায়ে সম্ভব নয়। এর জন্য চাই সংগঠিত প্রচেষ্টা, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং নাগরিক সচেতনতার জাগরণ।

১. জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা
পাঠাভ্যাস, বিজ্ঞান চর্চা, বিশ্লেষণধর্মী ভাবনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে ‘কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার’, ডিজিটাল লাইব্রেরি, বিজ্ঞান ক্লাব চালু করা।
গণআন্দোলনের মাধ্যমে জ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. গবেষণা ও উদ্ভাবনের কাঠামো তৈরি
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, ইনোভেশন সেন্টার ও টেক ল্যাব স্থাপন।
“জাতীয় উদ্ভাবন তহবিল” গঠন করে মেধাবী তরুণদের প্রজেক্টে অর্থায়ন।
কোডিং, AI, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু।
৩. রাজনীতির সংস্কার ও তরুণদের পুনর্গঠন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি বন্ধ করে ডিবেট ক্লাব, রিসার্চ ক্লাব চালু করা।
নেতৃত্ব বিকাশের জন্য নন-পলিটিকাল ‘স্টুডেন্ট লিডারশিপ প্রোগ্রাম’ চালু।
তরুণদের রাজনৈতিক শোষণ থেকে রক্ষা করতে আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪. নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার
পাঠ্যপুস্তকে মানবিকতা, সততা, দায়িত্ববোধের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা, গণমাধ্যমে নৈতিক নেতৃত্বের প্রচার এবং উদাহরণমূলক শাস্তি।
৫. সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার চর্চা
যুক্তিবাদী আলোচনা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিসরে চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে।
বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠগুলোকে দমন নয়, উৎসাহিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘তরুণ চিন্তাবিদ পুরস্কার’ চালু করা যেতে পারে।

উপসংহার
সমাজের ব্যর্থতাকে শনাক্ত করা মানেই সেটিকে বদলানোর প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের দায়িত্ব হলো এই শৃঙ্খল ভেঙে সমাজকে সঠিক পথে চালিত করা। কারণ পরিবর্তন আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের অবস্থান বোঝে, এবং সেটি বদলাতে সংকল্পবদ্ধ হয়।

"যদি তুমি সমাজের ভবিষ্যৎ বদলাতে চাও, তবে আগে তরুণদের দৃষ্টি বদলাও।"