গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত এ বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা-যা দেশের ইতিহাসের ৫৪তম বাজেট।
রোববার (২ জুন) বিকেলে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা। তার ভাষায়, “এটি কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার রূপরেখা।”
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৮.৫ শতাংশ। বাকি ৬৫ হাজার কোটি আসবে অন্যান্য উৎস থেকে।
অন্যদিকে জিডিপির ৩.৬২ শতাংশ ঘাটতি রেখে বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঘাটতির মধ্যে ৫৫ শতাংশ পূরণ হবে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে, বাকি ৪৫ শতাংশ বিদেশি ঋণের মাধ্যমে।
প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং জনপ্রশাসনে বরাদ্দ ১ লাখ ২১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য বরাদ্দ:
কৃষি খাতে: ৪৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ: ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা
প্রতিরক্ষা: ৪১ হাজার ৮০ কোটি টাকা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: ২২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে: ৩৭ হাজার কোটি টাকা
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারণ, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করতে হবে।”
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিচালন ব্যয় এবার ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। এর ৫৭ শতাংশ যাবে বেতন, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ পরিশোধে।
পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২২.৫ শতাংশ।
ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন কর কমে হয়েছে ০.০৩% (আগে ছিল ০.০৫%)
মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ৩৭.৫% থেকে কমিয়ে ২৭.৫% করা হয়েছে
তবে অতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের করহারে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, চলতি অর্থবছরেই মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে আপাতত মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে না, যা ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির খবর।
তিনি আরও বলেন, “এই বছর অতিরিক্ত ৬৪৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।”
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে আসে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গুরুত্ব। তিনি বলেন, “আমরা গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়াতে চাই, যাতে শহরমুখী চাপ কমে এবং আয় বৈষম্য হ্রাস পায়।”
এ লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, কুটির শিল্পে প্রণোদনা এবং এসএমই ঋণ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই বাজেটকে অনেকেই স্থিতিশীলতার বাজেট হিসেবে দেখছেন। বাজেটে কোনো জাঁকজমক নেই, বরং নিরাপদ ও বাস্তবমুখী লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, “এটি একটি রক্ষণশীল বাজেট হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্য ফেরাতে কার্যকর হতে পারে, যদি বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখানো হয়।”
অন্তর্বর্তী সরকারের এই বাজেট সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক চমক নয়, বরং অর্থনৈতিক ভারসাম্য, ন্যায়সঙ্গত বরাদ্দ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার প্রয়াস। এখন দেখার বিষয়, বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কতটা দক্ষতা ও স্বচ্ছতা দেখাতে পারে।
সততা, সংযম ও সমন্বয়ের এই বাজেট-নতুন সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষার নাম।