ঢাকা | ১ জুন ২০২৫ |
চার দিনের সরকারি সফর শেষে জাপান থেকে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ১৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বার্তায় জানানো হয়, টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্থানীয় সময় শনিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। জাপান সফরের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন কর্মব্যস্ত, অংশ নেন একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে।
ড. ইউনূসের সফরের অন্যতম প্রধান অর্জন ছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। শুক্রবার আয়োজিত এ বৈঠকে উভয় নেতা চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। চুক্তিটি কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বৈঠকে জাপানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ১.০৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর আওতায় তিনটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়:
৪১৮ মিলিয়ন ডলার: অর্থনৈতিক সংস্কার ও জলবায়ু সহনশীলতা উন্নয়নে ডেভেলপমেন্ট পলিসি লোন
৬৪১ মিলিয়ন ডলার: জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্প
৪.২ মিলিয়ন ডলার: মানবসম্পদ উন্নয়ন বৃত্তি কর্মসূচির জন্য অনুদান
প্রধান উপদেষ্টা টোকিওতে আয়োজিত 'বাংলাদেশ বিজনেস সেমিনারে' মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তুলে ধরেন। একই মঞ্চে দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের মধ্যে ছয়টি নতুন এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়, যা ভবিষ্যতে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময়কে এগিয়ে নেবে।
সফরের দ্বিতীয় দিন টোকিওর হিরাকাওচোতে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন সেমিনারে’ অংশ নেন ড. ইউনূস। সেখানে বাংলাদেশ ও জাপান দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় স্বাক্ষর করে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জাপানে তাদের কর্মসংস্থান সহজতর করা। জাপানি প্রতিনিধি দল ঘোষণা করে, আগামী পাঁচ বছরে তারা বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিতে চায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ড. ইউনূস শুক্রবার টোকিওতে ৩০তম নিক্কেই ফোরাম: ফিউচার অব এশিয়া-তে মুখ্য বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক উদ্ভাবনের ওপর জোর দেন।
ফোরামের পাশাপাশি তিনি মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে ড. ইউনূস বাংলাদেশকে আসিয়ানভুক্ত করার জন্য মাহাথিরের সমর্থন চান।
একই দিনে জাপানের খ্যাতনামা সোকা বিশ্ববিদ্যালয় ড. ইউনূসকে “সামাজিক উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক উন্নয়নে অবদানের জন্য” সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেন, ড. ইউনূসের কাজ বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
২০০৪ সালের নিক্কেই এশিয়া পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূস গত ২৮ মে টোকিও সফরে যান। এই সফরে তিনি প্রায় ২০টিরও বেশি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও গবেষকদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।