কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৮তম আসরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র স্থান করে নিলো মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে - আর সেখানেই নতুন ইতিহাস। পরিচালক আদনান আল রাজীবের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলী’ পেয়েছে জুরি স্পেশাল মেনশন - যা দেশের সিনেমার জন্য এক গৌরবময় মাইলফলক।
গতকাল শনিবার (২৪ মে) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৪০ মিনিটে) কান উৎসবের মূল ভেন্যু পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ‘আলী’-এর নাম ঘোষণা হলে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে উপস্থিত দর্শক এবং অতিথিরা। নির্মাতা রাজীব উঠে দাঁড়ালে কানে তৈরি হয় এক অভাবনীয় মুহূর্ত -টানা করতালিতে তাকে স্বাগত জানান উপস্থিতরা।
বাংলাদেশের পক্ষে এবারই প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় কোনো চলচ্চিত্র। ‘আলী’ নির্বাচিত হয় জমা পড়া ৪,৭৮১টি ছবির মধ্য থেকে ১১টি প্রতিযোগিতামূলক ছবির একটিতে। এটি কেবল একটি সম্মান নয়, বরং দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
নির্মাতা রাজীবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্জন শুধু তার একার নয়-এটি পুরো দেশের সৃজনশীল চলচ্চিত্র জগতের জয়।
১৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র আলী-এক কিশোর, যিনি বসবাস করেন বাংলাদেশের উপকূলীয় এক রক্ষণশীল শহরে, যেখানে নারীদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ। চমকপ্রদভাবে, আলী নিজেও গাইতে পারে নারীকণ্ঠে। সেই গুণের জোরেই সে স্বপ্ন দেখে শহরে গিয়ে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেতা আল আমিন।
ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের তানভীর হোসেন এবং ফিলিপাইনের ক্রিস্টিন ডি লিওন। লাইন প্রোডাকশন করেছে বাংলাদেশের 'রানআউট ফিল্মস'। এমন একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রযোজনা-টিমই সম্ভব করেছে আন্তর্জাতিক মানের এই সৃষ্টিকে।
এই অর্জনে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে দেশের বিনোদন অঙ্গনে। নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী বলেন, “বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ল টিম ‘আলী’। এটি কেবল একটি পুরস্কার নয়, একটি জাতির আত্মবিশ্বাস।”
অভিনেত্রী ও রাজীবের স্ত্রী মেহজাবীন চৌধুরী লিখেছেন, “বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কান থেকে পুরস্কার পেল! অভিনন্দন রাজীব ও পুরো টিমকে।”
নির্মাতা রেদোয়ান রনি বলেন, “তোমরা ইতিহাস গড়েছ। আমাদের স্বপ্নকে পৌঁছে দিয়েছ বিশ্বমঞ্চে।”
এবারের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগ ও লা সিনেফ বিভাগের প্রধান বিচারক ছিলেন জার্মান পরিচালক মারেন আদে। তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডে আরও ছিলেন আমেরিকান নির্মাতা রেইনাল্ডো মার্কাস গ্রিন, ফরাসি গায়িকা ও অভিনেত্রী ক্যামেলিয়া জর্ডানা, স্প্যানিশ প্রযোজক হোসে মারিয়া গার্সিয়া, এবং ক্রোয়েশিয়ান পরিচালক নেবয়শা স্লিয়েপসেভিচ।
মূল পুরস্কার ‘স্বর্ণপাম’ গেছে ইসরায়েলি পরিচালক তৌফিক বারহোম-এর ‘আই অ্যাম গ্ল্যাড ইউ আর ডেড নাউ’-এর ঝুলিতে।
‘আলী’-এর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের সামনে এক আশাব্যঞ্জক উদাহরণ হয়ে থাকলো-যেখানে স্বপ্ন, সাহস আর সৃষ্টিশীলতা একত্রে গড়ে তোলে ইতিহাস।