রাখাইনে করিডোর নয়,কেবল মানবিক সহায়তায় সহায়তা: জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-২১ ১৬:৫১:২২
image

ঢাকা, ২১ মে
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কোনও "করিডোর" চালুর বিষয়ে আলোচনা বা সম্মতি নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশ কোনো দেশ বা সংস্থার সঙ্গে করিডোর নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা করেনি, করবেও না।”
রাখাইনে যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় মানবিক সহায়তার প্রস্তাব আসার প্রেক্ষাপটে এই ব্রিফিং ডাকা হয়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “করিডোর শব্দটি একটি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য ব্যবহৃত হয়-যেখানে একটি অঞ্চল থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাখাইনের প্রসঙ্গে তেমন কোনো প্রেক্ষাপটই নেই।”
খলিলুর রহমান জানান, রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের নিজস্ব চ্যানেল দিয়ে ত্রাণ পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় সংস্থাটি বাংলাদেশকে সীমান্ত ব্যবহার করতে বলেছে। “তাদের চাওয়া শুধু সীমান্তসংলগ্ন লজিস্টিক সহায়তা,” বলেন তিনি। এতে করে সীমান্তের এপার থেকে ত্রাণ পাঠানো সহজ হবে, তবে সেটিকে 'করিডোর' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাখাইনের মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, “ইউএনডিপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেখানে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি রাখাইন থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করেছে।” তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে আর বাস্তুচ্যুত মানুষ গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।”
মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত আরাকান আর্মির সাথে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপন নিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, “সীমান্ত শান্তিপূর্ণ রাখাই আমাদের দায়িত্ব। তাই আরাকান বাহিনীর সঙ্গে সীমিত ও বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর যেন আর কোনো সহিংসতা, বৈষম্য ও বাস্তুচ্যুতি না হয়।
আরাকান বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে হওয়া উচিত। রাখাইনের শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামোর সব স্তরে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে-এটি কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।”
নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানান, রাখাইনে ত্রাণ কার্যক্রম চালু করতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানতে হবে। “সহায়তা সামরিকভাবে ব্যবহার না করা, প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং সংঘর্ষ বন্ধ রাখা-এসব শর্ত পূরণ করেই কেবল সহায়তা কার্যক্রম সম্ভব,” বলেন তিনি।
রাখাইনের মানবিক সংকটে আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মানবিক বিপর্যয় থেকে জীবন বাঁচানো শুধু বাংলাদেশের একক দায়িত্ব নয়-এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত কর্তব্য। রাখাইনে স্থিতিশীলতা ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নেই।”
নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নে ক্ষোভ প্রকাশ করে খলিলুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই। আমি আমেরিকায় পরিবারসহ থাকলেও আমি বাংলাদেশের নাগরিক, এবং সেটিই আমার একমাত্র পরিচয়।”
তিনি বলেন, “আমার ওপর যদি সন্দেহ করা হয়, তাহলে তারেক রহমান বা আরও অনেকের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে। আমি দুঃখিত, এভাবে একজন নাগরিককে প্রশ্নবিদ্ধ করা শোভন নয়।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি যেটা নই, আমাকে সেটা বানানো হলে সেটা শুধু আমাকে নয়, অন্য কাউকে আঘাত করতে পারে। বিচার হোক, তবে প্রমাণের ভিত্তিতে। আর না হলে, অনুগ্রহ করে থামুন।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, রাখাইন ইস্যুতে তারা শুধুমাত্র মানবিক ও কৌশলগত স্বার্থেই কাজ করছে, কোনো করিডোর বা আঞ্চলিক জটিলতায় জড়ানোর প্রশ্নই আসে না।