ডোবার পানিতে ডুবে স্বপ্নের মৃত্যু: হালুয়াঘাটে ভাইবোনের করুণ পরিণতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-১৫ ১৩:৪৫:৩৯
image

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের গোপীনগর গ্রাম। একটুকরো নিসর্গ আর শান্তির আঁচলে মোড়া এক নিভৃত জনপদ। অথচ সেই গ্রামেই বুধবার (১৪ মে) সন্ধ্যায় নামে শোকের ছায়া-ডোবার পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় দুই শিশুর, যারা ছিল শুধু আত্মীয়ই নয়, একে অপরের খেলাধুলার সাথীও।
নিহত দুই শিশু-সাদিয়া (৭) ও আলিফ মাহমুদ (৬) ছিল পরস্পরের মামাতো ও ফুপাতো ভাইবোন। শহীদ মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আর জাকির হোসেনের ছেলে আলিফ, দুপুরে বাড়ির পাশের ডোবার ধারে খেলছিল। সাদামাটা গ্রামীণ শৈশবের মতোই, যেখানে খেলনা হয় কাদামাটি আর পানির ঢেউ।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও তারা আর বাড়ি ফিরেনি। স্বজনদের হৃদয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকে অজানা আশঙ্কা। শুরু হয় খোঁজ। অবশেষে গ্রামবাসীর চোখ পড়ে ডোবার পানিতে নিথর পড়ে থাকা দুটি ছোট্ট শরীরের দিকে।
তাদের উদ্ধার করে হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান-তারা আর বেঁচে নেই।
এই সংবাদে কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। একসাথে খেলার কথা ছিল, বড় হয়ে ওঠার গল্প ছিল, কিন্তু ডোবার পানি সেই গল্প চিরতরে থামিয়ে দিল।
গ্রামে ছোট-বড় অনেক জলাশয়, ডোবা, পুকুর থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই কোনো নিরাপত্তা বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। শিশুদের নজরদারি নেই বললেই চলে। হালুয়াঘাটের এ ঘটনাও যেন সেই দীর্ঘদিনের অবহেলারই নির্মম পরিণতি।
স্থানীয়রা জানান, ডোবার চারপাশে কোনো বাঁশের ঘেরা বা সতর্কতার নোটিস ছিল না। অথচ ওখানে প্রায়ই শিশুরা খেলতে যায়।
হালুয়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাজন চন্দ্র পাল বলেন,
“দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটি একটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-এই মৃত্যু কি কেবল ‘অপমৃত্যু’? নাকি এটি এক নিষ্ক্রিয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?

গোপীনগরের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামের শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত। দুই শিশুর লাশ এখন কবরস্থানে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো জীবিত-
কেন ডোবার চারপাশে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না?
স্থানীয় প্রশাসন কি এ বিষয়ে আগে কখনো পদক্ষেপ নিয়েছিল?
শিশুদের নিরাপদে খেলার জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা ছিল কি?

সাদিয়া ও আলিফের মৃত্যু কেবল একটি গ্রামকে কাঁদায়নি, আমাদের সামষ্টিক উদাসীনতাকেও নগ্ন করে তুলেছে। যেখানে শিশুরা নিরাপদে খেলতে পারে না, সেখানে উন্নয়নের গল্প কেবল মুখে শোনা যায়-জমিতে বা ডোবায় নয়।
গোপীনগরের সেই ডোবার পাশে হয়তো এখনো কাদামাটিতে জমে আছে কিছু ছোট্ট পায়ের ছাপ-যা আর কখনো সামনে এগোবে না।