'আমার ভোট, আমার মেয়র'-ইশরাককে দায়িত্ব না দেওয়ায় নগর ভবনের সামনে জনস্রোত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক,
  • ২০২৫-০৫-১৪ ১৩:৪৯:৫৫
image

ঢাকা, ১৪ মে ২০২৫
সকালে ঘড়ির কাঁটা যখন নয়টা ছুঁয়েছে, নগর ভবনের প্রধান ফটকে তখন মানুষের ঢল। হাতে প্ল্যাকার্ড, গলায় স্লোগান-"ভোটে বিজয়ী মেয়র চাই, অন্যায় মানি না!" এমন কণ্ঠে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সামনে। দাবি একটাই—বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে অবিলম্বে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে।

আইনি স্বীকৃতি, কিন্তু প্রশাসনিক নীরবতা
২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ২৭ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গেজেট প্রকাশে রায় আইনি স্বীকৃতি পায়। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও শপথ গ্রহণ বা দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো অগ্রগতি নেই। এই নীরবতা ঘিরেই ফুঁসে উঠেছেন তার সমর্থক ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ।
একজন বিক্ষোভকারী বলেন, "নির্বাচন কমিশনের গেজেট জারি হওয়ার পরও দায়িত্ব না দেওয়া মানে আইন-আদালতের অবজ্ঞা। এটা শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রশাসনিক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ।"

বিক্ষোভে 'দল' ছাড়িয়ে 'জনগণ'?
বিক্ষোভে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সাধারণ ভোটার পরিচয়ে অংশ নেওয়া নাগরিকরাও। গোপীবাগের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন, যিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন, বলেন,
"আমি ভোট দিয়েছিলাম ইশরাককে। তখনই বুঝেছিলাম কারচুপি হয়েছে। এখন আদালতের রায়ে প্রমাণ হলো-ভুলটা আমার ছিল না। তাহলে এখনো কেন তাকে মেয়র করা হচ্ছে না?"
এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই বলছেন, এটি শুধু রাজনৈতিক বিচার নয়, নাগরিক অধিকার ও ভোটের মর্যাদা রক্ষার লড়াই।

'বিভিন্ন মহলের টালবাহানা', অভিযোগ ইশরাকপন্থীদের
সমর্থকরা অভিযোগ করছেন, ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি প্রভাবশালী মহল ইশরাকের শপথ অনুষ্ঠান ঠেকাতে নানা প্রশাসনিক কৌশল নিয়েছে। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ। তাদের দাবি, "আমরা শপথের দিন জানতে চাই। গেজেট হওয়ার পরও এত দীর্ঘসূত্রিতা কেন? এটা কি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আদালতের রায় অবজ্ঞার শামিল নয়?"

দায়িত্ব না দিলে লাগাতার কর্মসূচির হুমকি
বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আজকের মধ্যে শপথ ও দায়িত্ব হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট তারিখ না দিলে তারা লাগাতার কর্মসূচি ও গণআন্দোলনের ঘোষণা দেবেন। এই কর্মসূচি শুধু নগর ভবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছড়িয়ে যাবে বলেও হুঁশিয়ারি এসেছে।

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ইশরাকের সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমেও জোরাল আওয়াজ উঠেছে।
#MayorIshraqueNow, #RespectCourtVerdict, #MyVoteMyMayor হ্যাশট্যাগে ভরে উঠেছে এক্স (টুইটার), ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম। অনেকে বিষয়টিকে "ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শেষ সুযোগ" বলেও অভিহিত করছেন।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কী?
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে,
"আইনগত দিক সম্পন্ন হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।"
এই বক্তব্য নিজেই প্রশ্ন তৈরি করছে-নির্বাচিত হওয়ার পরও কি রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়া দায়িত্ব পাওয়া যায় না?

এক রায়, দুই বাস্তবতা
একদিকে আদালতের রায় ও নির্বাচনী গেজেট, অন্যদিকে দায়িত্ব না পাওয়া-এ যেন বাংলাদেশে নির্বাচনী বাস্তবতার একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
ইশরাক কি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক, নাকি একটি হারিয়ে যাওয়া ভোটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছেন-সেই প্রশ্ন এখন ঢাকার রাজপথ থেকে আদালতের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
এই দাবির জবাব এখন কেবল প্রশাসনের নয়, গণতন্ত্রেরও।