নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন স্থগিত,নির্বাচনী মাঠের বাইরে আওয়ামী লীগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-১২ ২৩:০৩:৩২
image

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মুহূর্ত-প্রথমবারের মতো দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারাল। সরকারের নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোমবার (১২ মে) রাতে দলটির নিবন্ধন স্থগিতের ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ রাত সোয়া ৯টার দিকে গণমাধ্যমকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন নিবন্ধন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে, দলটি এখন থেকে আর কোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

এক বিকেলের নাটকীয় মোড়
সোমবার বিকেলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়, বিচারাধীন ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ জড়িত থাকার অভিযোগের তদন্ত ও বিচারের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে উত্তেজনা। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে জরুরি বৈঠকে বসে নির্বাচন কমিশন। প্রায় চার ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর রাত সোয়া ৯টায় আসে চূড়ান্ত ঘোষণা-আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত।

৭৫-এর পরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির একমাত্র ১৯৭৫ সালের বাকশাল পর্বেই দেখা গিয়েছিল, যখন বহুদলীয় রাজনীতি একপ্রকার বিলুপ্ত হয়েছিল। এবারও রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হলো প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক উভয় কাঠামোর মাধ্যমে।
নির্বাচনী আইনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ৯০ জ অনুচ্ছেদ দফা ১(খ)-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো দল যদি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তার নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিত করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। এবার সেই ধারাটিই ব্যবহার করল ইসি।

‘নৌকা’ পাড়ে ভিড়ল না
২০০৮ সাল থেকে চালু হওয়া নিবন্ধন প্রথায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন নম্বর ছিল ৬, প্রতীক ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘নৌকা’। এই প্রতীকেই দলটি পরপর তিন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এই প্রতীকেই আর কোনো ব্যালটে দেখা যাবে না-এমন বাস্তবতা এবার সত্যি হয়ে দাঁড়াল।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত ৪৯টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ একটি ছিল। এখন দলটি নিবন্ধনহীন হয়ে পড়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

বিচার ও ট্রাইব্যুনালের অপেক্ষা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, জুলাইয়ের আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ইতিমধ্যেই সংশোধন করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়, এটি হতে যাচ্ছে একটি দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দলটি মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে শুধু নিবন্ধন নয়, সম্পদ বাজেয়াপ্তি, নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক অযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলটির ভাবমূর্তিতে বড় ধস নামতে পারে।

রাজনৈতিক ভূমিকম্পের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও ইসির সিদ্ধান্ত-দুটি মিলিয়ে ক্ষমতার রাজনীতির মেরুকরণে বড়সড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে-আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আগামী নির্বাচনের মান ও বৈধতা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে? আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো কী অবস্থান নেবে-তাও নজরদারির কেন্দ্রে।

অতীতে যাদের নিবন্ধন হারিয়েছিল
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী সরকার আমলেই নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর, ফ্রিডম পার্টির, পিডিপির, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনের এবং জাগপার। এবার সেই ভাগ্যবরণ করতে হলো খোদ আওয়ামী লীগকে।

সামনে কী?
এখন প্রশ্ন উঠছে-আওয়ামী লীগ কী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনগত লড়াইয়ে যাবে? আপাতত দলটির মুখপাত্ররা বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
একইসঙ্গে আলোচনা চলছে-বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নতুন কোনো দল কি আওয়ামী লীগের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে? নাকি সামনে অপেক্ষা করছে একদলীয় নির্বাচন?
যাই হোক, দেশের রাজনীতিতে ১২ মে ২০২৫ সালের রাতটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। এই রাতে প্রথমবারের মতো ‘নৌকা’ ডুবল নির্বাচনী মাঠ থেকে, আর একটি যুগের অবসান ঘটল-যা বাংলাদেশে রাজনীতির নতুন বাস্তবতা রচনা করতে যাচ্ছে।