“সংবিধান রাতারাতি লেখা যায় না, কিন্তু রাতারাতি ভেঙে পড়ে গণতন্ত্র”-এই সতর্ক বাণী নিয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যখন বলছেন, ‘নতুন সংবিধান প্রণয়নে সময় লাগবে’, তখন তা কেবল একাডেমিক বক্তব্য নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার সুষ্পষ্ট আভাস।
রোববার রাজধানীর মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায়, সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সংক্রান্ত নাগরিকদের ৭ দফা প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আইন অনুষদের অধ্যাপক।
৭২-এর সংবিধান এখনো কি পথ দেখায়?
আসিফ নজরুল মনে করছেন, নতুন সংবিধান নিয়ে আকাঙ্ক্ষা যতই থাকুক, তার বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ, জটিল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া। এ প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “নতুন সংবিধান না হওয়া পর্যন্ত ৭২-এর সংবিধানের মূল ভিত্তিগুলো ধরে রেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করেই এগোতে হবে।”
অর্থাৎ তিনি ‘অস্থায়ী উত্তরণে স্থায়ী কাঠামোর কাঠিন্য’ না চাইলেও সংবিধান নিয়ে ছেঁড়া টানাটানিকে সংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাখার পক্ষপাতী।
‘জুলাই সনদ’: কেবল দলিল নয়, এক নির্দেশনামা
আলোচনায় ‘জুলাই সনদ’-এর বিশেষ গুরুত্বের কথা জানান আইন উপদেষ্টা। এই সনদে উঠে এসেছে-
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস
দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা পুনঃবিন্যাস
বিচার বিভাগে বিকেন্দ্রীকরণ
বিভিন্ন সাংবিধানিক কমিশনের প্রস্তাবনা
তিনি বলেন, “আমরা ধরে নিয়েছি, জুলাই সনদের ওপর অনেক কিছুতে সবাই একমত হবেন। কিছু মৌলিক বিষয় ভবিষ্যতের সংবিধানেও থাকতে পারে।”
সংবিধান রচনা: একটি সময়সাপেক্ষ রাষ্ট্রিক প্রকল্প
আসিফ নজরুলের মতে, “নতুন সংবিধান প্রণয়নে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ৮–৯ বছরও লেগেছে। আমাদের ক্ষেত্রেও এটি কয়েক বছর লাগতে পারে।”
এজন্য তিনি “স্থায়ী সংবিধান না আসা পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী আইনসভা-বর্তমান জাতীয় সংসদ-৭২-এর সংবিধান অনুসারে কাজ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করে যাবে”-এই বাস্তবতা মেনে নিতে বলেন।
মেয়াদকাল না, আসল ইস্যু ক্ষমতা কাঠামো
প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের সীমা প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, এটি একটি জনপ্রিয় দাবি হলেও, কেবল মেয়াদ নির্ধারণ সমস্যার সমাধান নয়। বরং তিনি মনে করেন, “প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাসই সবচেয়ে জরুরি কাজ।”
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা মাত্রাতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত-এই বক্তব্যকে ভিত্তি করে তিনি বলেন, “কোন কোন দেশে দুই মেয়াদের সীমা আছে তা দেখুন। ভারতে, যুক্তরাজ্যে-এই সীমা নেই। কিন্তু ক্ষমতা তেমন কেন্দ্রভূতও নয়।”
বিচার বিভাগ ও উচ্চকক্ষ: ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য
সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা এসেছে, যাতে আইনি ভারসাম্য ও রাজনীতির বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। এই প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি যাতে স্বাধীনভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন, এমন একটি ধারণার কথাও বলেন আসিফ নজরুল।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধান বিচারপতির রয়েছে অসীম ক্ষমতা। তিনি দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি, অথচ তার নিয়োগ নিয়ে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নেই।”
শুধু সংবিধান নয়, প্রয়োজন আইনি সংস্কারও
“সব উত্তর সংবিধানে থাকে না”-এই কথাটি দিয়ে আসিফ নজরুল মনে করিয়ে দেন যে, সুশাসনের জন্য কেবল সংবিধান নয়, দরকার ছোট ছোট কার্যকর আইন, বিধিমালা এবং প্রশাসনিক সংস্কার। এ কারণেই তিনি আইনসভাকে চলমান ‘নিয়ন্ত্রক সংসদ’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলছেন, যতদিন না নতুন সংবিধান আসে।
শেষ কথায় এক নতুন পথে আহ্বান
এই আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট-বাংলাদেশ এখন এক সংবিধানিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন সংবিধানের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনীয়তা বাস্তব, তবে বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথের অংশ।
আর সে পথের সূচনা হতে পারে ‘৭২-এর সংবিধানের প্রগতিশীল মূল্যবোধ ধরে রেখে একটি বাস্তবমুখী সংস্কার প্রক্রিয়ায়’, যা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।