ওটিটির জোয়ারে হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকাই সিনেমার পরিচিত মুখগুলো!

  • বিনোদন ডেক্স
  • ২০২৫-০৫-০৯ ২২:১৯:৪২
image

বাংলাদেশের বিনোদন জগত যেন এক অন্তঃস্রোতকাল অতিক্রম করছে-প্রেক্ষাগৃহের পর্দা ম্লান হয়ে উঠছে, আর হাতে ধরা স্মার্টফোনে ছড়িয়ে পড়ছে কনটেন্ট বিপ্লব। এই স্রোতের নাম-ওটিটি। চুপি চুপি বদলে যাচ্ছে শিল্পের ভাষা,বদলে যাচ্ছে পরিচিত মুখের গুরুত্ব। একপাশে ওটিটির উত্থান, অন্যপাশে ঢাকাই সিনেমার অস্তিত্বসংকট।
নাটকের শিল্পীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ওটিটি দুনিয়ায়-তারা ‘গুটি’, ‘মহানগর’, ‘তাকদীর’, ‘মারকিউলিস’ কিংবা ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’-এর মতো সিরিজে হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য। অথচ এ সময়টাতেই বহু চেনা সিনেমার মুখ হারিয়ে গেছেন দর্শকের মানসপটে। এ যেন এক নিঃশব্দ প্রস্থান-নাট্যনির্ভর সিন্ডিকেটের ক্যানভাসে ম্লান হয়ে পড়েছে এফডিসিকেন্দ্রিক তারকারা।
তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে সক্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা ডজনখানেক ছাড়িয়েছে-‘চরকি’, ‘বিঞ্জ’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘টফি’, ‘আই স্ক্রিন’, ‘সিনেস্পট’, ‘দীপ্ত প্লে’, ‘টেলিফ্লিক্স’ থেকে শুরু করে ‘নেটফ্লিক্স’, ‘হইচই’, ‘অ্যামাজন প্রাইম’ বা ‘হটস্টার’-এর মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মও এই ভূখণ্ডে দর্শক ধরছে। কনটেন্টের প্রাচুর্যে তৈরি হচ্ছে নতুন দর্শকস্বভাব, বদলাচ্ছে শিল্পীর প্রাসঙ্গিকতা।

এফডিসি-যেখানে আজ নীরবতা বাজে
ঢাকাই সিনেমার প্রাণ ছিল যে এফডিসি,সেই প্রাঙ্গণে আজ কাজের চেয়ে অপেক্ষা বেশি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করা পতনের রূপকথা আজকের দিনে এসে নির্মম বাস্তবতা-কাজ নেই, বাজেট নেই, স্বপ্ন নেই। যারা একদিন ছিলেন পর্দার ঈশ্বর, আজ তাদের কেউ হচ্ছেন কন্টেন্টের বাইরে, কেউবা পেশা বদলেই হারিয়ে গেছেন অন্তরালে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্মাতা বলেন, “ওটিটির ভাষা আলাদা, স্ক্রিপ্ট আলাদা, দর্শকের রুচিও আলাদা। কিন্তু এফডিসিকেন্দ্রিক শিল্পীরা এখনও নিজেকে ঢালছেন পুরনো ছাঁচে। তাদের পারিশ্রমিকও বাস্তবতার বাইরে। ফলে নির্মাতারাও ঝুঁকছেন নাট্যশিল্পীর দিকে।”

সিন্ডিকেট না সম্ভাবনা-প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ওটিটিতে জনপ্রিয় সব কনটেন্টেই দেখা যাচ্ছে টিভি নাটকের পরিচিত মুখ। নির্মাতা থেকে অভিনেতা-প্রায় সবাই নাটকের জগতের। এতে সিনেমার শিল্পীরা ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, “এটা এখন একটি সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট কজন নির্মাতা আর শিল্পীই সব জায়গায় কাজ পাচ্ছেন। এতে শিল্পের বৈচিত্র্য হারাচ্ছে, সেই সঙ্গে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু প্রতিভাবান সিনেমা তারকা।”
অন্যদিকে নির্মাতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, “ওটিটি পেশাদারিত্ব দাবি করে। এখানে সময়ানুবর্তিতা, চরিত্র বিশ্লেষণ ও বাস্তবতানির্ভর অভিনয় খুব জরুরি। নাটকের শিল্পীরা সে দিক থেকে বেশি প্রস্তুত।”

বিনোদনের নতুন মেরুকরণ
ওটিটি আসলে কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তর। নাটক এখন হারাচ্ছে তার পূর্বের ঐতিহ্য, সিনেমা হারাচ্ছে তার বাজার, কিন্তু ওটিটি পাচ্ছে বিশ্বায়িত দর্শক। বাংলাদেশ এখন কেবল দেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের কথাও ভাবছে-চরকি, বিঞ্জ-এর মতো প্ল্যাটফর্ম মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপে এবং প্রবাসী বাঙালিদের কাছে নিজেদের প্রসার ঘটাচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তন সব শিল্পীর জন্য সুখকর নয়। এফডিসি-পালিত মুখগুলো ধীরে ধীরে হারাচ্ছে স্থান, তাদের জায়গায় আসছে টিভি নাটকের তারকারা।

ওটিটির ভবিষ্যৎ-সমতার সুযোগ না বৈষম্যের বিভাজন?
সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, ওটিটি হলো ভবিষ্যতের প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই ভবিষ্যৎ যদি কিছু নির্দিষ্ট মুখের দখলে চলে যায়, তবে তা আর শিল্প নয়, বরং হয়ে উঠবে ব্যবসার অদৃশ্য ফাঁদ। তাই এখনই সময় শিল্পকে উদার করতে হবে, সুযোগ দিতে হবে নতুনদের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোকে।
অন্যথায়, ওটিটির গর্জনের নিচে চাপা পড়ে যাবে ঢাকাই সিনেমার দীর্ঘ লড়াই, তার ইতিহাস ও তারকা হয়ে ওঠার স্বপ্ন।